
এইডা লিমোন এক ল্যাটিন পরিবারে জন্মেছিলেন ১৯৭৬ সনে ক্যালিফোর্নিয়ার সোনোমায়। ছোটবেলা থেকেই খুব নিসর্গঘেঁষা এইডা। শৈশবেই তাঁর মধ্যে দৃশ্যমান শিল্পকলার দিকে একটা সখ্যের ভাব গড়ে ওঠে, কেননা এইডা লিমোনের মা স্টেইসি ব্রেডি ছিলেন একজন পেইন্টার- ভিজুয়াল আর্টিস্ট। তুলির আঁচড়ে প্রকৃতির প্রকাশিত আড়ালের মধ্যে একটি মিথষ্ক্রিয়াশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে এইডার। হাতের কাছের কোন জিনিস, বা প্রাণী- তাদের খানিক নড়নচড়নের ভিতর তাঁর মধ্যে মনের অজান্তেই যেন একটি দ্বিতীয় ভুবন জন্মায়, ফলে অদেখা সংহতির একটা পরম্পরা গড়ে ওঠে। মধ্যএশিয়া বা ভারত অঞ্চলে মনস্তত্ত্বের যে গড়নকে আধ্যাত্মিকতা বলে- এইডা লিমোনেও এমন একটা নিরুদ্দেশ যাত্রার মরমিয়া দানা বাঁধে- চোখের সামনে একান্ত কিঞ্চিৎকর কিছুকে তিনি দিগন্ত ডিঙিয়ে মর্মের গন্ধের বাসনায় মিলিয়ে ধরেন। ধরা যাক, চোখের সামনেই একটি খরগোশ একলাফে একটি গাছের আড়ালে লুকায়, কী একটি বৈদ্যুতিক বাতি রাস্তার কোণায় একাকী জ্বলে আছে একটি হাবের পাশ ঘেঁষে- এইডা লিমোন এই চেনা, আটপৌরে একটি দৃশ্যপটকে সম্পূর্ণ অসীমের মোহর দানায় বেঁধে দেন- যা কোনদিন এভাবে ভাবেনি কেউ। এরমধ্যে খানিক নাটকীয় দ্বন্দ্ব রগড়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে; হয়তো নাটক বিষয়ে তাঁর একাডেমিক পড়াশোনার দহলিজ থেকেই তা আসে; অথবা তাঁর দার্শনিকতার মধ্যেই একান্তে জেন আছে, কিংবা আছে সুফি অরার সিদ্ধি। এইডা লিমোন যুক্তরাষ্ট্রের চলমান পোয়েট লোরিয়েট।
বাঙলা ভাষান্তর : বদরুজ্জামান আলমগীর
বেশির ভাগ স্বপ্ন যেভাবে জারি থাকে
প্রথমত এটি এক হরিণ হরিণ কুকুর,
তারপর ছোট্ট সোনামণি, দেখছি তার দিকে
সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি আমি
ডোবা চৌবাচ্চার গরম জলে চাইছি
একটু নাইয়ে উঠুক, তার পানি কফিরং কালো,
চৌবাচ্চার একদম খাড়া পাড়
ফলে সে টুপ করে নামবে, সিনান সহজে সারা।
আমি কুকুরকে জিগ্যেস করি
সে এক সোনামণিও বটে,
তুমি কী হ্যাঁ বলবে আমাকে-
যদি বলি পেয়ারা বন্ধু হবে আমার?
শিশুটি সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে
এবং কুকুর মশাইও হ্যাঁ বলে।
মাঝেসাঝে সে জলে ডুবে যায়
এমন হয়- আমরা একসাথে ডুবে যাই।
English version : How most of the dreams go.
একটি ভালো গল্প
কোন কোনদিন এমন হয়- হাড়ি পাতিল জমে পাহাড়, চায়ের টেবিলের উপর স্তূপাকারে জমে অগুনতি বই
অন্যকিছু এর ধারেকাছেও নাই। আজ আমার মাথায় কেমন গিজগিজ করছে খালি আরশোলা,
মাথা ভোঁভোঁ করছে, সারাশরীর ব্যথায় ঝরোঝর, চোখের মণি ফেটে যাচ্ছে, বিষে বিষে হুল ফুটে আছে
বুঝি লিকলিকে হিসহিস। কিন্তু আমার ডানদিকে দিব্যি
নাক ডাকাচ্ছে কুকুর, বামদিকে আরামসে ঘুমায় বিড়াল।
বাইরে নির্বিকার ফুটে আছে উজ্জ্বল লাল ফুলরাশি।
আমি আমার এক বন্ধুকে বললাম শরীর কেবলই শরীর।
সে আমার কথাটি ষোলআনা মেনে নেয়। আগে আমি
জঙ্গম গল্প ভীষণ পছন্দ করতাম, বাড়তি টুকরাটাকরা
জিনিসপত্র কেউ ছুঁড়ে ফেলে দিতো এই ভেবে, অচিরেই এগুলো গলেপঁচে গন্ধ ছড়াবে। আমার সৎবাবা বলেছিল
কীভাবে সে বাচ্চাকালে ছিল ঘরছাড়া, ঘুমাতোও রাস্তাতেই।
মাঝেমাঝে একটি রেস্তোরায় গ্রিলের নিচে ঘুমাতো
বেশিদিন ওই সুবিধাটুকু ভোগ করতে পারেনি সে, কেননা
তার দোস্তটিকে একদিন চাকরি থেকে ধুরধুর করে বের করে দিয়েছিল রেস্টুরেন্টের মালিক। একসময় ওই গল্প
আমার কাছে ভালোই লাগতো- মজা পেতাম আমি।
আকস্মিক আমার ভিতরে কেমন একটা ঘুরে দাঁড়ানোর
আশকারা চলে আসে। কিন্তু আমি কেমন জানি হয়ে
উঠি- আমার মনে হতে থাকে দয়াশীলতাই সারকথা,
যেমন একসময় মনে হতো কান্নার উপর কোন আকুতি নাই
সেইসময় আমি পনেরো বছরের একটা ছোটমোটো ছেলে
ক্ষুধার ছোটে দুনিয়াটা ঘুরছিল আমার- এরমধ্যে সে
একটা আস্ত পিজ্জা নিয়ে আসে- ছোট ছোট টুকরোয় কাটা
সেই পিজ্জা- যতোক্ষণ আমার চোখের পানি বন্ধ না হয় ততোক্ষণ একটা একটা করে পিজ্জার টুকরা সে আমার
মুখে তুলে দিয়েছিল।
আমি কেবল বলেছিলাম- আমার খুব ক্ষুধা লাগছিল,
সে ঘাড় নেড়ে আমার সমান ব্যথায় সায় দেয়- তাই হবে!
English version : A good story.
অলৌকিক মাছ
আমি আগে সবাইকে বুঝাতাম যে, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আসলে তখন একটা রোখ ছিল- অন্ধকারের ভিতর গুমর হয়ে আছে এমন কারো সঙ্গে কথা বলতে আমার ভীষণ ভালো লাগতো। ভাবতাম- আচ্ছা, একটি আওয়াজকে তার কাছে পৌঁছাতে কতোটা সীমানা ডিঙাতে হবে- যে বিশ্বচরাচরের বাইরে কোথাও অবস্থিতি করে- কথাটির মজ্জায় কতোটা উত্তুঙ্গ শক্তি থাকলে এটি সম্ভব! একবার নিউমেক্সিকোর চিমায়োতে এক প্রার্থনালয়ে গভীর অন্ধকারের ভিতর নতজানু হয়ে নিজেকে সঁপেছিলাম আমি; আমার মনে হয়েছিল এমনই তো করার কথা। এই কাণ্ডটি করেছিলাম- যখন দেহের মূল থেকে যে একটি প্রবাহ শীর্ষাভিমুখী হতে পারে তার হদিস আমার জানা ছিল না, আমার সাকল্যে বোঝ ছিল- আমারই রক্তে আমার চেতনাকে নিমজ্জনে রাখতে হবে। ওখানে একজায়গায় লেখা ছিল- দুনিয়া সৌভাগ্যে জারিত, এখানে খেলায় মেতে যেও না। মাথার দিব্যি, আমি বলছি শোন- এই দুনিয়ায় আমি খেলবো, মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমিখেলায় মাতবো প্রতিদিন। আমি এক অলৌকিক মাছের উপর নিজেকে বেমালুম সঁপে দিয়েছি- একবার নিউ ইয়র্ক শহরে এক আচানক মাছ আমার সারাজীবনের গন্তব্য বাতলে দিয়েছিল। তার আগে আমার কোন নিধি ছিল না- ওইদিনই আমি জানি আমার এতোটুকু দেহের ভিতর যে সীমিত জলের অসীমতা- তাতেই আকুল সাঁতার কাটে এক অলৌকিক মাছ।
English version : Miracle Fish.
জোড়া তদারকি
আমি কেন যে আদত জিনিসটা দেখে উঠিনি:
বাহুল্য ছিল? দুইটা পরিবার, দুইটা রান্নার টেবিল
সম্পূর্ণ আলাদা দুটি নিয়মনীতি, ভিন্ন দুটি ধারা,
পৃথক দুটি মহাসড়ক, ভিন্ন-ভিন্ন দুই সৎ বাবা-মা-
তাদের জিয়লমাছ রাখার মটকা আলাদা, তাদের
নিজস্ব কায়দায় দুইরুচির গানের পছন্দ, দুইরকম
রান্নার যোগাড়যন্ত্র, আলাদা আলাদা সিগারেট,
বইপড়ার ঝোঁকে একের সাথে অন্যের দুস্তর ফারাক।
ধরা যাক, ভাঙা গানের থালি আপনমনে বেজে চলেছে
আবার ক্যাঁচ ক্যাঁচ থামছে এসে একই ফাটায় বারবার-
আমার টু শব্দটা করবার, তা পালটে দেবার জো নেই।
প্রতি রোববার আমার হয় অবধারিত এক বলের দশা-
একবার আমাকে রাখা হয় এই বাড়ি তো ফের ওইবাড়ি
এ আমার জন্য ছিল এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষার সামিল।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার- দুটি জায়গা-ই আমার ভালো লাগে।
ফলে যা হয়- আমি মানুষ একটা কিন্তু মগজ হয় দুইটা
একদম আলাদা দুই মাথা, সম্পূর্ণ আলগা দুটি তাগিদ।
যেখানেই থাকি- মনে হবেই ইশ, ওইখানটায় আমি নাই,
এদিকে কী যে আনন্দে আটখানা- বাড়ি আছি, বাড়ি!
English version : Joint Custody.
প্রায় চল্লিশ
আজ পাখিরা ছিল নিদারুণ হতচ্ছাড়া গোছের
পাখিদের পাগলামি দেখতে আমরা ঠাঁই দাঁড়িয়েছিলাম।
শীতের কামড়ে জর্জরিত পাখিরা তারস্বরে চেঁচাচ্ছিল
আমাদের বাঁচাবার জন্য- হয়তো ওরা ভাবছিল-
আমরা এতো কনকনে শীত সামলে উঠতে পারবো না,
আমাদের কোন নিরাপদ কোটরে সিঁদানো দরকার।
ঘরের ভিতর তোমার বাবা দেখো গোস্বায় ফুঁসছে
চুলার উপর গরম স্যুপ ঠাণ্ডায় নেতিয়ে গেল বলে!
আমি কখনই এমন কোন কেউকেটা নই যে
পয়াভারী হুকুম তালিম করতে পারি, তা-ও বলছি
আমি মোটের উপর লম্বাচওড়া জীবন চাই একখান।
তুমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেও বটে, কেবল বললে
তা হোক, কিন্তু নীরোগ স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচো, আমরা
কথাটায় আমল আনি আর উনুনের আগুন তাতিয়ে দিই।
যা-কিছু চুলায়- আমরা অতঃপর একসাথে আহার করি
ছোট ছোট লোকমায় ধার তুলি যেন ঘরোয়া শস্ত্রে
শীতে মুখ বসে যাচ্ছে- তা পরোয়া না করে।
English version : Almost forty.
অলংকরণঃ তাইফ আদনান