
বন্ধু আজাদ খান দাঁড়িয়ে ছিল ছাতক হাসপাতাল পয়েন্টে। আমি ইজিবাইক থেকে নেমে পড়ি। হাতে হাত মিলিয়ে জিজ্ঞেস করি, কুদ্দুস ভাই কই ?
অইযে চাখানায় বসে আছে।
চল।
বাসায় যাবেন না ?
এখন না।
আমি ভেতরে ভেতরে ছটফট করছি। জীবনে এই প্রথম একজন পাথর শ্রমিক বাউলের সাক্ষাৎকার নেব ! হাড়ে-গোস্তে-পরানে জীবন-জগৎ তো পাথরের মতোই শক্ত, নিষ্ঠুর।
সম্ভবত আমি জন্ম বাউল। তাই খাঁটি বাউলদের বৈরাগ্য, গভীর চিন্তক মন, মানুষ ও জীবের প্রতি প্রেম আমাকে অনেক বছর আগে থেকেই একটু একটু করে দীক্ষা দিচ্ছিল। বাউল মকদ্দস আলম উদাসী (জন্ম : ১৩৫৪ বাংলা এবং মৃত্যু : ০৫.০৭.২২ ইং) ভাইয়ের জীবনের শেষ দিনগুলোতে আমি ছিলাম তাঁর খুব কাছাকাছি। উদাসী ভাই ঘন্টার পর ঘন্টা এক আসনে বসে থাকতে পারতেন। হাতের একটা আঙুলও নড়তো না। আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেও পাঁচ মিনিটের বেশি থাকতে পারি না। মাঝে মাঝে তিনি আমার দিকে ঈশ্বরের মতো গভীর চোখে তাকাতেন। তাঁর মোটামোটা কালো ঠোঁটের ফাঁকে ঝিলিক দেওয়া বিষন্ন-হাসির মাঝে আমি বুঝি জীবন-জগতের অনেকখানি দেখে ফেলেছিলাম ?
হাওরপাড়ের ছোট ছোট গ্রাম ঘুরে, পাহাড়ের উপর থেকে নিচের দিকে খোঁজতে খোঁজতে পেয়ে গেলাম ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারির একজন শ্রমীককে। তিনি কুদ্দুস বাউল। কুদ্দুস বাউল তিন টাকা ফুট থেকে পাথর কোয়ারিতে কাজ শুরু করেছিলেন। এখন করেন দেড়শ টাকা ফুট। ভোলাগঞ্জ বিষয়ে তাঁর আজব একটা অভিজ্ঞতা হলো, সেখানে কোনো টয়লেট নাই। পাহাড়ের সেই পাথরময় রুক্ষ-উপত্যাকায় দীঘির মতো বড় বাতিল একটা কোয়ারি আছে। কয়েক হাজার শ্রমীক-মালিকের জন্য সেইটাই টয়লেট। সেই বিশাল গহ্বরের চারপাশ ঘিরে, পাছার কাপড় তুলে, শতশত মানুষ হাগে। সেখানে কোটিপতি মালিকের পাশে বসে হাগতে দেখা যায় তার শ্রমীককে। চারপাশে সারি সারি পাছা উদাম মানুষ। সবাই মাথা নিচু করে কাম সারছে। কেউ কারো দিকে তাকায় না। রোজ রোজ শতশত মানুষ এইভাবে এক সাথে আদিকাম সারতে সারতে তারা মার্কক্সবাদ-মাউবাদ চর্চা করেন।
ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাছ থেকে নোয়ারাই গ্রাম হয়ে উত্তরের দিকে তিন-চার কিলো হাঁটলে দেখা যায় দুই পাশে সারি সারি টিলা। তার ফাঁকে অসংখ্য ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর। ঘন সবুজের মধ্যে ছবির মতো তকতকে পরিস্কার এইসব কুঁড়ে ঘর দেখলে থেকে যেতে ইচ্ছা করে। কোনোকোনো বাড়ির সামনে ফুলের গাছও দেখেছি। খাস জমিতে বসতকারি শ্রমীকরা সারা দেশের নানা স্থান থেকে এসেছেন। অইসব গ্রামগুলো ঘুরতে ঘুরতে জেনেছি, তাঁদের অনেকেই মুর্শিদ ভক্ত। দূর্বীণ শাহ, শাহ আব্দুল করিম, উকিল মুন্সী কিংবা ক্বারী আমিরউদ্দীন তাঁদের গুরু। চর্মচোখে গুরুর মুখ না দেখলেও এইসব মহাজনদের গান গাইতে গাইতে, গানের তত্ত্ব আর পাথরের মতো কঠিন জীবনটা বুঝতে বুঝতে তাঁরা হৃদয়ে হৃদয়ে গুরু-শিষ্য হয়ে গেছেন। যাঁরা তরিকা পন্থী বাউল তাঁদের চলন-বলনে শ্রমীক সুলভ রুক্ষতা নাই বললেই চলে।
কুদ্দুস বাউলের সাথে হোটেলে বসে চা-নাস্তার পর সিগারেটের পর্ব শুরু হতেই আমি আজাদকে জিজ্ঞেস করি, কোথায় বসা যায় ?
চলেন সুরমা নদীর ওপারে।
সেখানে সারি সারি ক্রাসার মেশিন মুখ থুবরে পড়ে আছে। ভোলাগঞ্জের পাথর কোয়ারী বন্ধ তাই মেশিনও স্তব্দ। কুদ্দুস বাউল কথা বলেন সিলেটি ভাষায়। তাঁর নারী সুলভ মিহি-মিষ্টি উচ্চারণগুলোর মাঝেও একটা অদ্ভুদ সুর খেলা করে। হিন্দি ভাষার মতো সিলেটি ভাষাতেও একটা জাদু আছে। তাই গোটা সাক্ষাৎকারটা সিলেটি ভাষায় লেখার লোভ উঁকি মারে। তবু আমি পাঠকের কথা ভেবে আমার জবানে অর্থৎ সিলটি ও ময়মনসিঙ্গীর মিশেলে লিখেছি।
সাক্ষাৎকার :
শেখ লুৎফর : আপনি এই বাউল জগতের খবর পাইলেন কীভাবে ?
কুদ্দুস বাউল : কম বয়সে প্রথম আমি যাত্রা গানে যাইতাম। একজন মুরুব্বী কইলো, তর যহন গানের অত শখ, কণ্ঠও ভালা তে বাউল গান গাছনা ক্যায়া ?
আমি কইলাম কইলে তো অইতো না, গুরু ধরতে অইবো। গুরু পাই কই ? জ্ঞান হওয়ার পর থাইকা আমি দূর্বীণ শাহ’র ভক্ত। তাঁর সবগুলা বই আমি জোগার করছিলাম। ভালা ভালা গানগুলা গাইতে পারি। তাইনের গানের মর্ম আমার চৌখ খুইল্যা দেয়। তাইনেই আমার আসল গুরু। আমার একটা নাও আছিল। আমি ভোলাগঞ্জ থাইকা পাথর আইনা ছাতকে বেচতাম। ভোলাগঞ্জ থাইকা পিয়াং নদীতে পড়তেই আমি গানে টান দিতাম। আমীরউদ্দীন রাধারমণ উকিল মুন্সী শাহ আব্দুল করিম ভাইয়ের অধিকাংশ গান মুখস্ত হইয়া গেছিল। সারাদিন কামের পর রাইতে পাথর কোয়ারীর ঝুপড়ি ঘরে গানের আসর বসত। সেইখানেই ঢোল দোতারা তবলা বাইজাইতে শিখি। সারাদিন পাত্থর টানি, রাইত হইলে যেখানে বাউল গান হয় সেখানেই যাই। মঞ্চে উঠবার চেষ্টা করি। গাই।
শেখ লুৎফর : শুধু দূর্বীণ শাহ’র গানে মজলেন কেন ?
কুদ্দুস বাউল : মনের আবেগে।
শেখ লুৎফর : দূর্বীণ শাহ’র গানের কোন জিনিস ভালো লাগে ?
কুদ্দুস বাউল : তত্ত্ব কথা।
শেখ লুৎফর : কী তত্ত্ব ?
কুদ্দুস বাউল :
‘নাম চরণে ঘূর্ণীদানে চরণ ভিক্ষা চাই ওগো এলাহী
তোমার মতো দরদি আর নাই।
এই গানগুলা গাইলে আমার মনে একটা শান্তনা থাকে।
শেখ লুৎফর : পাথরের কাজ ব্যবসা ইতাদি বিষয়ে কিছু বলুন।
কুদ্দুস বাউল : প্রথম আমার একটা ছোডু নাও আছিল। পাথর আনতাম-বেচতাম। এই বড় বড় পাত্থর। আটজন-দশজনে তুলতো একটা পাত্থর। একটু অবসর পাইলে নাওয়ে বইসা কলস বাজাইতাম আর গাইতাম। খালি দূর্বীণ শাহ’র গান। এইসব বিশ বছর আগের কথা।
শেখ লুৎফর : আপনার নিজের বিষয়ে কথা বলুন।
কুদ্দুছ বাউল : আমার বয়স চল্লিশ। পিতার নাম হাছান আলী, মাতার নাম ফুলমালা, শিক্ষাগুরু ইসমাইল শাহ, দীক্ষাগুরু মঈন ভান্ডারী, বাড়ি গাঙ্গের হেপার (সুরমা নদীর ওপারে), রাজার গাঁও।
শেখ লুৎফর : নারী বাউল শিল্পীদের কথা একটু বলুন।
কুদ্দুস বাউল : এইতা নাচফাল (নাচানাচি) আমার ভালা লাগে না।
শেখ লুৎফর : তারাতো মুর্শিদি গায় ?
কুদ্দুস বাউল : আল্লা-রসুল-মুর্শিদে কইছে গানের লগে লগে নাচফাল কর, শরীল দ্যাহাও, বুকের উড়না ফালাইয়া দ্যাও ? আপনি মুর্শিদের বালক (শিষ্য), মানইনশে কইতো ধন্য হইছে। না, তারা ফালাইয়া-নাচাইয়া আরো নষ্ট করবো। এইডা কী কইয়াম, কইতেও পাপি। ভালা কেউ কেউ আছে, পর্দা কইরা গায়। গানের কথার লগে অন্তরেও তারা থাকে সুন্দর। এইরহম খুব কম।
শেখ লুৎফর : বাউল গানের ভালো শ্রুতা-দর্শকদের বিষয়ে কিছু বলুন।
কুদ্দুস বাউল : দুই জাতের শ্রুতা। অহন বাউল গানের গায়কও দুই জাতের। নাচফালের গায়করা যে মঞ্চে গায় আমি যাই না। আর আমরা যদি যাই, তাদের মজাটা হয় না। আর এইরহম আসরে গান গাইয়া আমরা শান্তি পাই না।
শেখ লুৎফর : আপনি বায়না করে আসরে গাইতে যান ?
কুদ্দুস বাউল : আমি টাকা দিয়া গান গাই না। কিন্তুক মন্দ কিতা, আমার গান ভালা লাগছে, তারা আমারে ফোন দিছে, আসেন ভাই আমরা একটু আনন্দ করতাম। আমি ছুইট্টা যাই। যেখানে দ্যাখমু টাকা দিয়া খেলামেলা, সেখানে যাই না। কারণ সেইখানে গিয়া পাইমু মহিলা। মহিলা শিল্পী গ্যাছে, আমার কোনো হিংসা নাই, কিন্তু এরা খালি নষ্ট। ভাই রে সব নষ্ট হইয়া গ্যাছে।
শেখ লুৎফর : কাজ ফেলে এইযে গানের পিছে ছোটাছুটি, আপনার সংসার আছে না ?
কুদ্দুস বাউল : গান শুনে আপনার আনন্দ লাগবো, কইবো, বাউল তো গান গায় না মনের একটা দুঃখ মিটাইয়া যায়, বোচ্ছেন জ্বালা-দুঃখ মিটাইয়া যায়। শ্রুতার মনে একটা দুঃখ ছিল, গান শুনে সে-ও দুঃখ মিটায়া যায়। দিতো আছিন দশ ট্যাহা, দিবো আপনেরে পঞ্চাশ ট্যাহা। আপনে যদি ভালোবাসেন, ভালোবাসা গানের সুরে কইয়া যাইবো।
শেখ লুৎফর : আপনার স্ত্রী কি গান পছন্দ করেন ?
কুদ্দুস বাউল : হ্যাঁ। উনিও মুর্শিদ ধরছেন। দুইজন এক জাগাত। (মঈন ভান্ডারী) উনিও গান গায়। আসরে না। মাঝে মাঝে রাইতে যহন খুব বিষ্টি পড়ে তহন সে আমারে গান শুনায়।
শেখ লুৎফর : গান বিষয়ে আরেকটু বলুন।
কুদ্দুস বাউল : কী কইয়াম ? ট্যাহা আছে আপনার, মহিলা শিল্পী পাঁচটা নিয়া আসেন।
শেখ লুৎফর : খাঁটি বাউল গানের চর্চার বিষয়ে বলুন।
কুদ্দুস বাউল : আছে আছে। অনেক! বহুত! অইসব আসরে যত মহিলা শ্রুতা আইবো, পর্দার আড়ালে বইসা গান শুনবো। মহিলা শ্রুতার লাগি ব্যবস্থা আছে। অন্য কোনো ইয়া নাই।
শেখ লুৎফর : আপনার তো বাউলের বেশ নাই। কেন নাই ?
কুদ্দুস বাউল : আপনারে একটা জিনিস কই, খালি বেশ ধরলে তো বাউল না। বাউলের আসল পরিচয় হইল, অন্তর থাইকা যে একটা জ্বালা আছে, এই জিনিসগুলা বাউলের মন থাইকা যায়, গানের মইধ্যে দ্যায়া যায়, এইগুলা দর্শকে শুনলো। বাউল বাইরে না ভিত্তে।
শেখ লুৎফর : আপনার নিজের বিষয়ে আরেকটু বলেন।
কুদ্দুস বাউল : মানুষের খুশিতে আমি খুশি। আল্লার খুশিতে আমি খুশি থাকি। একজনে আমারে ভালা পাইছে, এইটা আমার খুশি। এশা নাই নিশা নাই, রাইত তিনটায় আমারে একলা পাইবা। খালি ফোন দ্যায়া আমারে কইবা, আমি আছি। মানুষরে ভালো আনন্দ দেওয়াও একটা ইবাদত।
শেখ লুৎফর : পাথর টানার সময় শ্রমীকরা কী কী গান গায় ?
কুদ্দুস বাউল : এইতাতো দুঃক্কের একটা গান হইবো। যেমন সিরাজ মিয়া সাধকের একটা গান :
‘তোমায় ভালোবেসে আমার সার হইয়াছে চোখের জল,
আমারে বানাইলে রে বন্ধু তোমার পিরিতির পাগল।’
শেখ লুৎফর : এখনো আপনার তারণ্য আছে। স্ত্রী-সঙ্গ ঘনঘন করেন ?
কুদ্দুস বাউল : উনিও তো অন্তরে অন্তরে বাউল। আমগর চাহিদা খুব কম। মাসে-পনরোদিনে।
শেখ লুৎফর : আপনার গান, সাধনা এইসব বিষয়ে স্ত্রীর কোনো ভূমিকা আছে ?
কুদ্দুস বাউল : উনি গান ভালা বোঝে। কোন আসরে কী গাইতাম, কীবায় গাইতাম, সূর-উচ্চারণ ঠিক কইরা দ্যায়। উনি বাউল গান লেখেন। সূর করেন। বাউল জগতের যত বই আমার ঘরে আছে তাইন পড়–ইন। যদি ভুল করে ফেলি, তাইন ঠিক কইরা দ্যান। তাইন আমারে গানটা চর্চা কইরা দ্যান।
শেখ লুৎফর : আপনার স্ত্রীকে কেমন শ্রদ্ধা করেন ?
কুদ্দুস বাউল : নিজের মা আছে না ? মায়রে একটা শ্রদ্ধা করতাম না ?
আমার ভালো লাগে। কুদ্দুস বাউলের কথায় আমার মায়ের মুখ মনে পড়ে। স্ত্রীর শান্ত-গভীর চোখ হৃদয়ে ঝলক মারে। আর আমার মেয়ে, একমাত্র মেয়ে? পুরুষের জন্ম, জীবন-যৌবন আর মৃত্যু, সবখানে নারীর মমতাময়ী হাত...। তবু আজ পদে পদে নারীরা লাঞ্ছিত-বঞ্চিত। কত জ্ঞানী-গুনি আর শিক্ষিত পুরুষের নিষ্ঠুর হাতের নিচে রোজ রোজ পিষ্ঠ হচ্ছে অবলার দেহ-মন। অথচ প্রায় নিরক্ষর এই শ্রমীকের কঠিন পেশীর নিচে হৃদয় নামক পরমাত্মায় নারীর জন্য কত শ্রদ্ধা, প্রেম আর মমতা !
শেখ লুৎফর : আজাদ তুমি কুদ্দুস ভাইকে দুইটা প্রশ্ন কর।
আজাদ খান : গানের লগে থাইকা তোমার কী ধরনের শান্তি আছে ? এইযে মানুষের অত জ্বালাযন্ত্রনা, অন্য মানুষের লগে নিজের তফাতটা ইয়া করো।
কুদ্দুস বাউল : আমি কোনো মানুষের লগে চলি না। আমার গান হইল জীবন-মরণ। এই গানে যদি আমারে নেয়গি, আমার শান্তনা। ভাই রে আমি বাউল গানে ভাসি গ্যাছি...।
ছাতক
সুরমা নদীর পাড়
০৮.০২.২৩ ইং
অলংকরণঃ তাইফ আদনান