জলধি / প্রবন্ধ / রুশ কথাসাহিত্যে বিপ্লবী চেতনার প্রতিচ্ছবি
Share:
রুশ কথাসাহিত্যে বিপ্লবী চেতনার প্রতিচ্ছবি

রুশ কথাসাহিত্য প্রথাগতভাবে সমাজ পরিবর্তনের প্রতি এক গভীর সংবেদনশীলতা ও প্রতিফলন নিয়ে গড়ে উঠেছে। রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অব্যবহিত আগে ও পরে, বিশেষত ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে, সাহিত্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে এবং সেই পরিবর্তনগুলো সাধারণ মানুষের জীবন, চিন্তাভাবনা এবং সংগ্রামের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমর্থন এবং আন্দোলনকে থিম হিসেবে বিবেচনা করে সাহিত্য তৈরির যে প্রবণতা দেখা যায়, তা মূলত শ্রমিক শ্রেণির অধিকার, শ্রেণিসংগ্রাম এবং বিপ্লবী চেতনার ওপরে ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল। বিপ্লব-পূর্ব সময় থেকেই রুশ কথাসাহিত্যের মাধ্যমে সমাজের শোষিত শ্রেণির জীবনের চিত্রায়ন ও তাদের সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছিল, যা পরে সমগ্র সমাজ পরিবর্তনের জন্য এক শক্তিশালী উপাদান হিসেবে কাজ করে।

কথাসাহিত্য যখন সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে ভূমিকা রাখে, তখন তা সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরে প্রবাহিত হয়ে তাদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও বিপ্লবী চেতনা বৃদ্ধি করে। লেখকরা গল্পের মাধ্যমে শ্রেণি-শোষণের যন্ত্রণার প্রকৃতি, শ্রেণিভেদ, এবং শোষিত জনগণের মধ্যে একতা ও বিপ্লবী শক্তি গড়ে তোলার ধারণা প্রদান করেন। এই ধরনের সাহিত্য সমাজের জন্য কার্যকরী পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে, যা শুধুমাত্র পাঠকদের মনের পরিবর্তন ঘটায় না বরং তারা বাস্তব জীবনে কার্যকর পরিবর্তন আনার দিকে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠে।

রুশ কথা-সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতিফলন একটি গভীর ও বিশদ বিষয়, যা প্রধানত ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজে গভীর পরিবর্তন আসে এবং সাহিত্যে এই পরিবর্তনসমূহের প্রতিফলন পাওয়া যায়। লেখকরাও তাদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেণির মর্যাদা এবং বিপ্লবী চেতনা তুলে ধরেছেন।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ একটি গুরুত্বপূর্ণ রুশ উপন্যাস যা শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম, সামাজিক শোষণ এবং শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রদান করে। এটি অস্ত্রভস্কির অন্যতম প্রধান কাজ, যেখানে তিনি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ধারণা ও শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। ইস্পাত উপন্যাসটি রুশ সমাজের শ্রমিক শ্রেণির জীবন ও সংগ্রামের কাহিনী। প্রধান চরিত্র নিকোলাই ইভানভিচ তৎকালীন অভিজাত শ্রেণির যুবক, যিনি শ্রমিকদের মধ্যে প্রবেশ করে তাদের সংগ্রামের সাথে পরিচিত হন। নিকোলাই নিজে একজন যন্ত্রশিল্পী, কিন্তু তার পেশাগত জীবন শোষণের স্বাদ নেয় এবং এই শোষণের বিরুদ্ধে তার জাগরণ ঘটে। তাঁর সংগ্রাম এবং চেতনা ক্রমশ এক রাজনৈতিক বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হয়, যা শ্রমিক শ্রেণির একত্রিত হওয়ার এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো বার্তা দেয়।

অস্ত্রভস্কি এই উপন্যাসে শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা এবং তাদের সংগ্রামকে প্রধান উপজীব্য করেছেন। এখানে দেখানো হয়েছে যে, শ্রমিকরা একদিকে তাদের দৈনন্দিন জীবনে নিঃস্ব ও শোষিত, অন্যদিকে তারা বোধগম্যভাবে আত্মবিশ্বাসী এবং একাত্ম হয়ে ওঠে। এটি তাদের মধ্যে একটি সংগ্রামী চেতনা তৈরি করে, যা একত্রিত হয়ে সমাজ পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যায়। অস্ত্রভস্কি শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী শক্তি এবং চেতনা বিস্তার করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। উপন্যাসে শিল্প ও কলকারখানায় শোষণ প্রথার প্রতি তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। এখানে শ্রমিকরা তাদের অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেন, যেখানে তাদের জীবনের প্রতি শ্রেণিভেদ এবং অর্থনৈতিক শোষণ বিদ্যমান। অস্ত্রভস্কি সমাজের ক্ষমতাশীল শ্রেণির শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
    
উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বিপ্লবী চেতনা এবং রাজনীতির ভূমিকা। অস্ত্রভস্কি ও শ্রমিকদের জীবনে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়তে থাকে এবং তারা উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, কেবলমাত্র শ্রেণি-সংগ্রাম এবং বিপ্লবের মাধ্যমেই তারা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। অস্ত্রভস্কি সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা ছড়িয়ে দেন। নিকোলাই চরিত্রের বিকাশ উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর মধ্যে শোষণ এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে জাগরণের এক সৃজনশীল উদাহরণ লক্ষ্য করা যায়। প্রথমদিকে, নিকোলাই কিছুটা অজ্ঞ এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চিন্তিত ছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তিনি শ্রমিক শ্রেণির দুঃখ-কষ্ট এবং সংগ্রামের সাথে সংযুক্ত হয়ে তাদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন। তাঁর চরিত্রের এই পরিবর্তনটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সার্থকতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করে। অস্ত্রভস্কি তার লেখার শৈলীতে বাস্তববাদী প্রবণতা অনুসরণ করেছেন। তিনি শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব জীবনের সমস্যা এবং সংগ্রামকে বিস্তারিতভাবে চিত্রায়িত করেছেন। তিনি ইস্পাত উপন্যাসে শ্রমিকদের মানসিক অবস্থা, শোষণের যন্ত্রণা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সচেতনতার বিষয়টি গভীরভাবে অনুসন্ধান করেছেন।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ইস্পাত উপন্যাসটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি রুশ সমাজের শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম এবং তাদের বিপ্লবী চেতনার এক বাস্তব এবং জীবন্ত চিত্র। উপন্যাসটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং শ্রমিক আন্দোলনের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে, যা রুশ বিপ্লবের পটভূমিতে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অস্ত্রভস্কি একদিকে শোষণ ও শ্রেণী সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতা এবং অন্যদিকে বিপ্লবী সংগ্রামের চেতনা তুলে ধরে সমাজের রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।

ম্যাক্সিম গর্কির ‘মা’ (১৯০৬) একটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস যা রুশ সমাজের শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম এবং তাদের বিপ্লবী চেতনার উন্মেষকে কেন্দ্র করে রচিত। গর্কি এই উপন্যাসের মাধ্যমে রুশ বিপ্লবের পূর্ববর্তী সময়ের শ্রমিক আন্দোলনের শক্তি ও শ্রমিকদের রাজনৈতিক সচেতনতার বিকাশকে তুলে ধরেছেন। ‘মা’ শুধুমাত্র একটি পারিবারিক কাহিনী নয়, বরং একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বোধের সাথে মিশে থাকা সাহিত্য, যা শ্রমিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিপ্লবী সংগ্রামের গুরুত্বকে বিশ্লেষণ করে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হল পেলাগিয়াÑএকজন সাধারণ নারী, যিনি প্রথমে তার পুত্র পেট্রা (একজন শ্রমিক) এর বিপ্লবী কর্মকা- সম্পর্কে অবগত হন এবং পরবর্তীতে নিজেই একটি বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হন। পেট্রা শ্রমিক আন্দোলনের একজন কর্মী, যে তার সমবয়সী ও শ্রমিকদের মধ্যে এক নতুন চেতনা সৃষ্টি করতে চায়। তার আন্দোলনের মাধ্যমে, তার মাÑপেলাগিয়াÑশ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের সাথে পরিচিত হয়ে উঠেন এবং এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিপ্লবের প্রতি নিজের সমর্থন প্রকাশ করেন।
উপন্যাসটি মূলত শ্রমিকদের রাজনৈতিক জাগরণ এবং তাদের মধ্যে শ্রেণী সংগ্রাম ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের বিকাশের গল্প।

গর্কি ‘মা’ উপন্যাসে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতার বিকাশকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। গল্পের শুরুতে, প্রধান চরিত্রÑপেলাগিয়া, বিপ্লবী আন্দোলনের বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু পেট্রা (তার পুত্র) এবং অন্যান্য বিপ্লবী কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি জানাতে শুরু করেন যে, শ্রমিকদের মধ্যে এক নতুন শক্তি তৈরি হয়েছে, যা তাদের নিজেদের অধিকার ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম করবে। উপন্যাসটি শ্রমিকদের রাজনৈতিক জাগরণের একটি চমৎকার চিত্র তুলে ধরে, যেখানে সাধারণ মানুষ কিভাবে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার মধ্যে থেকে রাজনৈতিক চেতনা অর্জন করতে পারে।

গর্কি উপন্যাসে মা ও পুত্রের সম্পর্কের ওপওে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন । পেলাগিয়া শুরুতে তার পুত্র পেট্রার বিপ্লবী কর্মকা-ের প্রতি সন্দেহ পোষণ করতেন, কারণ তিনি ছিলেন একজন সাধারণ মা; যে তার সন্তানের নিরাপত্তা এবং সুখের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, পেলাগিয়া বুঝতে পারেন যে তার পুত্রের কর্মকা- কেবল তার নিজের ভবিষ্যতের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। এর মাধ্যমে, গর্কি মা-ছেলের সম্পর্কের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপ সৃষ্টি করেছেন, যেখানে মায়ের চেতনাগত পরিবর্তন এবং পুত্রের সংগ্রাম একে অপরকে সমর্থন করে।

মা উপন্যাসের অন্যতম প্রধান থিম হল শ্রেণি-সংগ্রাম। গর্কি শ্রমিকদের মধ্যে শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, শ্রেণি বিভাজন এবং শ্রমিকদের বিপ্লবী শক্তি তৈরি করার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছেন। উপন্যাসটি একদিকে শ্রমিকদের সংগ্রাম, অন্যদিকে বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার গল্প বলে। গর্কি শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার জন্য তাদের জাগরণ এবং একতাবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ করেছেন। ‘মা’ কেবল একটি পারিবারিক গল্প নয়, বরং এক রাজনৈতিক উপাখ্যান, যা শ্রমিকদের মধ্যে বিপ্লবী চেতনার উন্মেষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পেলাগিয়া যখন তার পুত্র পেট্রার বিপ্লবী কর্মকা-ের মধ্যে অংশ নেন, তখন তার নিজের জীবনেও এক নতুন বিপ্লবী চেতনা উদ্ভূত হয়। তিনি বুঝতে পারেন যে, বিপ্লব কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের পথ। উপন্যাসটি বিপ্লবী চেতনার বিকাশ এবং জনগণের একত্রিত হয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার বার্তা দেয়।

গর্কি তার লিখনশৈলীতে বাস্তববাদী প্রবণতা অনুসরণ করেছেন। তিনি শ্রমিক শ্রেণীর জীবনের বাস্তবতা, তাদের সংগ্রাম এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষা সরল এবং বোধগম্য, যা সাধারণ মানুষ এবং শ্রমিকদের জীবনকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে চিত্রিত করে। গর্কি পাঠককে শ্রমিকদের জীবনের সংগ্রাম এবং তাদের অনুভূতির গভীরে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়েছেন।

ম্যাক্সিম গর্কির ‘মা’ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা দেয়, যা রুশ শ্রমিক শ্রেণীর জাগরণ এবং বিপ্লবী চেতনার উন্মেষকে চিত্রিত করে। গর্কি উপন্যাসটির মাধ্যমে, একদিকে শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রাম এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে মায়ের চেতনা এবং পুত্রের বিপ্লবী কর্মকা-ের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ অনুসন্ধান করেছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস যা শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রামের শক্তি এবং বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে, এবং সেই সঙ্গে একটি পরিবারের মাধ্যমে সমগ্র সমাজের পরিবর্তনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ইভান বুনিন (১৮৮২-১৯৫০) ছিলেন রুশ সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত লেখক, যিনি বিশেষভাবে শ্রমিক শ্রেণির জীবন ও তাদের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে অনেক ছোট গল্প লিখেছিলেন। তার লেখা গল্পগুলো মূলত রুশ সমাজের শোষিত জনগণের অবস্থা, তাদের দুর্দশা এবং সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে। বুনিনের গল্পগুলোতে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষ করে শোষণ এবং শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন তা তার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

বুনিনের গল্পগুলোতে শ্রমিকদের শোষণের চিত্র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শ্রমিকরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে নিজেদের জীবিকা অর্জন করলেও, তারা সমাজের শোষিত শ্রেণী হিসেবে প্রতিফলিত হয়। তার গল্পগুলোতে, যেমন ‘অন্তহীন রাত’ বা ‘জীবনের সাথী’, শ্রমিকরা একদিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে শোষিত এবং অন্যদিকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। তিনি শ্রমিকদের শারীরিক অবস্থা, তাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম এবং বঞ্চনার বর্ণনা দিয়েছেন, যা সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ধারার প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করে।

বুনিন তার গল্পগুলোতে রুশ সমাজের শ্রেণী বিভাজন এবং শ্রেণী সংগ্রামের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার গল্পগুলোতে দেখা যায়, শ্রমিকরা শুধুমাত্র তাদের দৈনন্দিন শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন না, বরং তারা সমাজের অবিচারের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যেতে চান। বুদিনের গল্পগুলো, বিশেষ করে ‘হালকা দিন’ বা ‘মুক্তির আশায়’, শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে জাগরণের একটি স্পষ্ট সংকেত দেয়। এখানে শ্রমিকরা নিজেদের সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে শোষণ এবং অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যা সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দিকে একটি ইঙ্গিত।

বুনিনের গল্পে বিপ্লবী চেতনা এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রচার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিকরা যখন তাদের অধিকার রক্ষা করতে এবং শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে শুরু করেন, তখন তাদের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সচেতনতা উদয় হয়। বুনিন তার লেখায় এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছেন যেখানে শ্রমিকরা শুধুমাত্র নিজস্ব জীবনের উন্নতি চান না, বরং তারা তাদের সমবয়সী এবং পুরো সমাজের জন্য বৃহত্তর পরিবর্তন চাইছেন। ‘বিপ্লবী মিছিল’ বা ‘শেষ আশা’ গল্পগুলোতে এই বিপ্লবী চেতনার উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে শ্রমিকরা নিজেদের শোষক শ্রেণী ও সমাজের অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে সমাধান খোঁজে।

বুনিনের গল্পে যেসব শ্রমিক চরিত্র রয়েছে, তাদের জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে, যেখানে তারা নিজস্ব জীবন, শোষণ এবং অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু করেন। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের পক্ষে একটি শক্তিশালী বিশ্বাস গড়ে ওঠে। ‘মৃত্যু পথ’ এবং ‘অন্য জীবন’ গল্পে, শ্রমিকরা শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রাম শুরু করেন। তাদের এই পরিবর্তন সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি প্রবল বিশ্বাস ও সমর্থনকে চিত্রায়িত করেছে।

বুনিনের গল্পগুলোতে শ্রমিকদের শুধু শোষিত হিসেবে চিত্রিত করা হয়নি, বরং তাদের মানবিক মর্যাদাও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি শ্রমিকদের মধ্যে কষ্ট, সংগ্রাম এবং আত্মসম্মান ধারণা করেছেন, যা সমাজতান্ত্রিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শ্রমিকরা যে শুধু শ্রমের মাধ্যমে সমাজকে শক্তিশালী করে, তা নয়; তাদের মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তি রচনা করা সম্ভব, এটি বুনিনের লেখার অন্যতম এক বার্তা।

বুনিনের গল্পগুলো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং শ্রেণি-সংগ্রামের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থন প্রতিফলিত করে। তিনি শ্রমিকদের সংগ্রাম এবং তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন এবং তাদের একত্রিত হয়ে বৃহত্তর সমাজ পরিবর্তন সাধনের প্রক্রিয়া চিত্রায়িত করেছেন। তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছেন এবং তার গল্পের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তার গল্পগুলোর মাধ্যমে তিনি শ্রমিক শ্রেণিকে একটি শক্তিশালী বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে চিত্রায়িত করেছেন, যারা সামাজিক শোষণ ও অবিচারের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

এখন যদি আমরা নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’, ম্যাক্সিম গর্কির ‘মা’ এবং ইভান বুনিনের ছোট গল্পের দিকে তাকাই, তাহলে পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করি য়ে, এই লেখকদের কাজ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং বিপ্লবী চেতনার প্রসারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ‘ইস্পাত’ উপন্যাসের মাধ্যমে অস্ত্রভস্কি শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র নিকোলাই ইভানভিচ নিজে শোষণের শিকার হয়ে শ্রমিকদের সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন, এবং একত্রিত হয়ে রাজনৈতিক বিপ্লবী শক্তিতে পরিণত হন। এটি শ্রমিক শ্রেণীর একটি সংগ্রামী চেতনার উন্মেষের প্রতীক হয়ে ওঠে, যেখানে শোষণ ও শ্রেণি সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটে।

উপসংহার: গর্কির ‘মা’ উপন্যাসটি শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক সচেতনতা এবং তাদের মধ্যে বিপ্লবী শক্তির বিকাশের কাহিনী। পেলাগিয়া নামক এক সাধারণ নারী তার পুত্রের বিপ্লবী কর্মকা-ের মাধ্যমে রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠেন এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এখানে মা ও পুত্রের সম্পর্কের মধ্যে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা প্রতিফলিত হয়, যেখানে মা-ছেলের বিপ্লবী কার্যক্রম এবং শ্রেণী সংগ্রাম একে অপরকে সমর্থন করে। রুশ কথাসাহিত্যে বিশেষত মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ এবং নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ উপন্যাসে রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট ও গভীর। এই দুটি সাহিত্যকর্ম শুধু রুশ বিপ্লবের ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও আদর্শিক পটভূমিই নয়, বরং তৎকালীন রুশ জনগণের মানসিকতা, সংগ্রাম এবং একটি নতুন সমাজব্যবস্থার জন্মের উত্তাল অধ্যায়ও তুলে ধরে।

মাক্সিম গোর্কির ‘মা’ (১৯০৬) উপন্যাসটি রুশ বিপ্লবের সূচনা পর্বের শ্রেণি সংগ্রামের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এটি মূলত একটি মা, পেলাগেয়া নিলোভনার, এবং তার ছেলের রাজনৈতিক চেতনা ও আত্মত্যাগের গল্প। ‘মা’-উপন্যাসে দেখানো হয়েছে কীভাবে শ্রমিক শ্রেণি নিজেদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত হতে শুরু করে। পাভেল ও তার সহকর্মীরা বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের দমনমূলক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এই সংগ্রাম রুশ বিপ্লবের প্রাথমিক পর্যায়ে শ্রেণি সংগ্রামের প্রতীকী উপস্থাপনা। উপন্যাসটি শুধুমাত্র শ্রেণি সংগ্রামের কথাই বলে না, বরং এক সাধারণ মা কীভাবে সমাজতান্ত্রিক চেতনায় রূপান্তরিত হন, তাও তুলে ধরে। পুত্র পাভেলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে মা নিজেও আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠেন। এটি দেখায়, রুশ বিপ্লব কেবল তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক বিষয় ছিল না, বরং তা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গভীরে প্রভাব ফেলেছিল। গোর্কি দেখিয়েছেন, একক ব্যক্তি থেকে শুরু করে পুরো একটি শ্রেণি কীভাবে বিপ্লবী আন্দোলনের অংশ হয়ে যায়। এই সংগ্রাম কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং একটি জাতির মুক্তির প্রতীক।

নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত” (১৯৩২) উপন্যাসটি রুশ বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের পুনর্গঠন এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বাস্তবায়নের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে রচিত। এটি মূলত পাভেল করচাগিনের আত্মজীবনীমূলক কাহিনি, যেখানে তার জীবন সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতিষ্ঠার গল্প বলা হয়েছে। ‘ইস্পাত’ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মত্যাগ, কঠোর পরিশ্রম এবং আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা তুলে ধরে। এটি রুশ বিপ্লব-পরবর্তী যুবসমাজের চেতনাকে প্রতিফলিত করে, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে একটি সমানতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায়। পাভেল করচাগিন একজন আদর্শ বিপ্লবী। তার জীবন দেখায় কীভাবে ব্যক্তি তার স্বার্থ ত্যাগ করে সমাজের বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করতে পারে। অস্ত্রভস্কি দেখান যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ মানুষকে কঠিন পরিস্থিতিতেও শক্তি জোগাতে পারে। ‘ইস্পাত’ কেবল একটি উপন্যাসের শিরোনাম নয়, বরং এটি বিপ্লবী চরিত্রদের মানসিক দৃঢ়তা এবং নতুন সমাজের ভিত্তির প্রতীক। পাভেলের চরিত্র এবং তার সংগ্রাম সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত ব্যক্তিদের প্রতীকী উপস্থাপনা।

‘মা’ এবং ‘ইস্পাত’ উভয় উপন্যাসই রুশ বিপ্লবের ভিন্ন পর্যায় এবং ভিন্ন দিককে তুলে ধরে। ‘মা’ বিপ্লবের প্রস্তুতি ও আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতীক, যেখানে সাধারণ মানুষ ক্রমশ রাজনৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শোষণের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়। এটি একটি মানবিক এবং আদর্শিক রূপান্তরের গল্প। অন্যদিকে, ‘ইস্পাত’ বিপ্লব-পরবর্তী পুনর্গঠনের প্রতীক, যেখানে একটি নতুন সমাজ তৈরির জন্য চরম আত্মত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন ছিল। এটি একটি আদর্শিক দৃঢ়তার প্রতীক, যা ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের পথে নির্দেশনা দেয়। এই দুই সাহিত্যকর্ম শুধু ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সাহিত্যিক চিত্রায়ন নয়, বরং রুশ সমাজে সমাজতান্ত্রিক আদর্শ কীভাবে মানব জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলেছিল, তার অনন্য দলিল। এগুলো আজও বিপ্লবী চেতনা, আদর্শ এবং সামাজিক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হিসেবে বিবেচিত হয়।



অলংকরণঃ তাইফ আদনান