জলধি
/ প্রবন্ধ
/ বাংলাদেশের সাহিত্যে উত্তরাধুনিক প্রবণতা
বাংলাদেশের সাহিত্যে উত্তরাধুনিক প্রবণতা

উত্তরাধুনিকতা ইউরোপের সাথে এশিয়া বা আফ্রিকার ভেদাভেদ জ্ঞানকে নাকচ করতে চায়। আধুনিকতা থেকে বের হওয়ার প্রবণতাই উত্তরাধুনিকতা।আধুনিকতার ভেতরের আদর্শবাদকে ভেঙে তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা Post Mordanizm. জাতীয়তাবাদের বশ্যতা স্বদেশী শোষণ বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে যেতে বাধা পায়।তাই ১৮ শতক থেকে ঔপনিবেশিক অঞ্চলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় লেখক - বুদ্ধিজীবীরা কথা বলেননি।
উত্তরাধুনিক লেখকদের বলা হয় উত্তর কাঠামোবাদী(post structuralist) জ্যাক দেরিদা Freeplay of structure এর যে ধারণা দিয়েছেন, তা উত্তরাধুনিক লেখকদের লেখায় লক্ষ্য করা যায়।
উত্তরাধুনিকতার জন্ম বিশ শতকের সত্তুরের দশকে।দার্শনিক ফ্রেডরিক নিৎসে, লিয়েতার,দেরিদা,হাইডেগার ও লাকা এ বিষয়ে নিজ নিজ দার্শনিক অবস্থান উপস্থাপন করেছেন।ফিকশন (গল্প উপন্যাস) এর ক্ষেত্রে প্রচলিত কাঠামো ভেঙে, ঐতিহ্যগত শৈলী ও নির্মিতি, আখ্যান নন্দতত্ত্বের ধারণা থেকে বের হয়ে আসছেন উত্তরাধুনিক গল্পকার।এর মানে তার সামনে কোন আদর্শিক মানদণ্ড থাকছে না।
জঁ ফ্রাঁসোয়া লিওতার বলেছেন, " postmodern means incredulity Towards Metanarative.ফলে ধর্ম,মার্কসবাদ, সাম্যবাদ, ইতিহাস ও মানবিকতাবাদ প্রভৃতি মেটান্যারেটিভ সমূহে ভাঙন দেখা দিয়েছে। জেগে উঠছে ছোট ছোট ' বিকল্প ন্যারেটিভ '। বৃহৎ পরিপ্রেক্ষিতসমূহের ভেতরকার সকল অসঙ্গতি ও স্ববিরোধী বিষয় সমূহকে পৃথক পৃথকভাবে তুলে ধরছে উত্তরাধুনিকতা।
উত্তরাধুনিক সাহিত্যে দ্বিতীয়ত আসবে মেটাফিকেশন( Metafication). উইলিয়াম এইচ গাস ১৯৭০ সালে তাঁর Fiction and Figurs of life বইতে এ ধারণা দেন।মেটাফিকেশনে চরিত্র, লেখক, পাঠক সবাই সর্বাবস্থায় গল্পের ভেতর থাকেন।গল্পটি পাঠককে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে,তারা যা পড়ছে, তা বাস্তব নয়, নির্মিত ( কাল্পনিক)
হোমারের মহাকাব্য ' অডিসি' তে মেটান্যারেটিভ টেকনিকের প্রয়োগ ঘটেছে। সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্যে খ্যাতিমান উত্তরাধুনিক লেখক ফরাসি কথাসাহিত্যিক জন ফাওলস্।
সার্ভেন্তেসের ' দন কিহাতো' উপন্যাস। তিনি আরব্য ঔপন্যাসিকের গ্রন্থের অনুবাদ অনুসরণে কাহিনি লিখেছেন। কিন্তু এসবের বাস্তব কোন ভিত্তি বা অস্তিত্বই নেই। বাস্তবে এসব তাঁর কাল্পনিক বা বানানো গল্প। আর এ হচ্ছে মেটাফিকেশন।
সহজ গল্প লেখকের হাত থেকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জটিল করে তোলে। মোজাফফর হোসেন এর " ছুঁয়ে দেখা জীবন " গল্পটি মৃত্যুর ভেতর দিয়েই তার কাঙ্ক্ষিত জীবনের পুনর্জন্ম। হারুনুর রশিদ এর " রুদেবিশ শেকাবের ব্যতিক্রমী জীবন " উল্লেখযোগ্য উত্তরাধুনিক উপন্যাস। গাব্রিয়েল মার্কোজ এর উপন্যাসও এসব অতি প্রাকৃতিক উপাদান মেলে।
উত্তরাধুনিক কবিতা গদ্য ছন্দের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে।ফলে কবিতার বিকাশ ও বিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। বাংলা ভাষায় উত্তরাধুনিক কবিরা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে পারছেন না বলে অভিযোগ আছে। উত্তরাধুনিক ধারণায় কবিতায় শব্দের ব্যঞ্জনায় ভরপুর রূপকল্প থাকলেও দুর্বোধ্যতা যেন অন্তঃসারশূন্যতা না হয়।
পাল্টে যাওয়া পৃথিবীতে নিজের অবস্থান ও ভবিতব্য নিয়ে ভাবতে হবে উত্তরাধুনিক লেখক ও পাঠককে।
প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের জনপ্রিয় আধুনিক কবিদের গত এক দশকের কবিতা উত্তরাধুনিক পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে কি না? কারণ কবি নিজ সময় থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ। আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, শঙ্খ ঘোষ, নির্মলেন্দু গুণের দিকেও এ অভিযোগের তীর খাড়া আছে।
মজনু শাহ এর " জেব্রা মাস্টার " (২০১১) এবং জুয়েল মোস্তাফিজ এর " ভাতের ভুগোল" সাম্প্রতিক কালে সাড়া জাগানো কাব্য।
মজনু শাহর জেব্রা মাস্টার এর কবিতাগুলো গদ্যগন্ধী অনির্ণেয় স্বর অনাস্বাদিত পৃথিবীর মতো।কবিতাগুলো শিরোনামহীন। নির্জনতার ভাষায় তৈরি অসংশোধিত শিল্পের অসম্ভব অসুখে আক্রান্তের জন্যে পরম চিকিৎসা। কবিতাগুলো গদ্যাকারে অতিলৌকিক পরাবাস্তব।
জেব্রা মাস্টার থেকে উদ্ধৃতি:
" আমার প্রতিভা নাই, সারাক্ষণ তাই হলদে পাখিদের / পথনির্দেশ শুনে চলি,যে- পথে তোমার ষড়ভুজাকৃতি শস্য কারাগার ( পৃষ্ঠা ৮)
বিবিধ উদ্ভট উপমা কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে আজগুবি মায়াময় ঘোর।যে ঘোরে নম্র ভায়োলেন্সও আছে।
মজনু শাহর জেব্রা মাস্টার যেন ব্যতিক্রমী কাব্যউপন্যাস।জীবনানন্দ দাশ,শঙ্খ ঘোষ ও আবদুল মান্নান সৈয়দদেরই বিবর্তিত রূপ।
৩২ পৃষ্ঠার একটি কবিতা খুব আকর্ষণ বোধ করছি :
"...... আমি তোমাকেই খুঁজছি হে ঋষি বালক, যে- তুমি পরীক্ষার খাতায় লিখেছিলে,' বড় হয়ে আমি হতে চাই প্রুসিয়ান ব্লু রঙের একটা ডাকবাক্স। একযুগ পর, আজ এক গুরু পত্নীর উদ্দেশ্যে আমি চিঠির বদলে পোস্ট করতে চাই হাঁসের পালক।কিন্তু তার জন্যে সর্বাগ্রে চাই জ্যান্ত ডাকবাক্স, তা আমি কোথায় পাবো? ফলে, সব ভুলে আমি কেবল তোমাকে খুঁজছি। অথচ পেছনে কত কাজ পড়ে আছে, এক গর্ভবতী আমার হাত ধরে পার হতে চেয়েছিল বাঁশের সাঁকো, কুড়িয়ে আনা বোতল - বার্তাগুলো অপঠিত ছিল..... "
বলা হচ্ছে, এসব কবিতায় লেখকের আত্মজীবনী সকল মানুষের অসহায়ত্ব ও দৈনন্দিন যন্ত্রণার প্রতীকী রূপায়ণ। গদ্যকার মুহিত হাসানের সাথে তাল মিলিয়ে বলা যায়, অপার্থিব সুরের চালক অদৃশ্য জাদুদন্ড হাতে, আখ্যান ও সংগীতকে কবিতার সাথে অনন্তকাল সেলাই করে চলেন, বিশ্লেষণ শেষে জন্ম নেয় নতুন ভাষাবৃক্ষ।সৃষ্টি হতে থাকে গাণিতিক আঙ্গিকের অসামান্য আকাশ। এভাবেই রচিত হয় " বহু শিল্পের ইশারা ভরা - জেব্রা মাস্টার।
ক্রমাগত চুরমার হতে থাকা পৃথিবীতে ফের নতুন করে দেখা মিলবে অবোধ্য বাস্তবের।
১৩ ডিসেম্বর ২০২৪
অলংকরণঃ তাইফ আদনান