জলধি / পাঠ-পর্যালোচনা / প্রান্তিকজনের গল্প- গদ্যশৈলী ও শিল্পপ্রয়োগের যথাযথ আখ্যান
Share:
প্রান্তিকজনের গল্প- গদ্যশৈলী ও শিল্পপ্রয়োগের যথাযথ আখ্যান
বাংলাদেশের শক্তিমান একজন কথাসাহিত্যিক হলেন ইউসুফ শরীফ । বিগত পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল ধরে যাঁর গল্পে হৃদয় আন্দোলিত হচ্ছে পাঠকের। হতে বাধ্য । কারণ সেই চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন বঙ্কিমচন্দ্রের বই পড়ে যাঁর সাহিত্যপাঠ শুরু হয় তাঁকে সীমিত জ্ঞানে অনুধাবন করা কঠিন । একই কারণে কঠিন তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গভাবে কিছু বলা । 
 
কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ- এর গল্পগুলো মানব চেতনা প্রবাহরীতি নির্ভর । তাঁর আছে গভীর মানব জীবন দর্শন , সম্মৃদ্ধ জ্ঞান ও দল মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি । জীবন অভিজ্ঞতায় তিনি পরিপক্ক - তাই তো গল্পগুলোতে শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত শ্রেণি  ও অবহেলিত মানবজীবনের বিচিত্র অসহায়তার গল্প তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন । লেখকের কাজ কি শুধুই গল্প বলে যাওয়া নাকি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে গল্পে মেসেজ দেয়া? - এ নিয়ে বিতর্ক আছে পাঠকমহলে। তবে কথাশিল্পী ইউসুফ শরীফ একদিকে যেমন কেবল গল্প বলে যাননি আবার পাঠকের ওপর কোনো বার্তাও চাপিয়ে দেননি - তিনি নিজস্ব ধারার ভাষা মাধুর্যে গল্প লিখে গেছেন । মনোযোগী হয়েছেন চরিত্রগুলোর অসহায়ত্ব ও মনের গভীরের ক্ষত পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে - নতুন করে ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করে হৃদয় প্রসারিত করতে । 
 
লেখকের মানবজীবন পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বিস্ময়কর , অত্যন্ত সূক্ষ্ণ ও গভীর জীবনবোধ সম্পন্ন । এজন্যই বোধ করি তাঁর গল্পগুলো নিজস্ব ধারার গদ্যশৈলী ও শিল্পপ্রয়োগশৈলীর অসাধারণ নৈপুণ্যে সম্মৃদ্ধ । গল্পের বিষয়বস্তুগুলো ভাবলে দেখা যায় - তিনি খাঁচায় বন্দি পাখিটি কেবল দেখেন না ; পড়েন পাখির মনের ভাষা, ঝরে যাওয়া পালকের দুঃখ, আহার্য্য পাত্র হতে অবহেলে পড়ে যাওয়া শস্যদানা এমনকি খাঁচার গল্পও। আমরা যা অবহেলা করি বা গুরুত্বসহকারে দেখি না লেখক তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে গল্প গেঁথে  চমকে দেন পাঠককে । যেমন - 
 
মৃৎশিল্পি হরিনারায়ণ পাল-কে (কাল্পনিক ও রূপক চরিত্র) নিয়ে কে ভেবেছে কবে? শৈল্পিক মন থাকাটা বুঝি অভিশাপ - বাপ দাদার বংশে কে কবে মাটির মাঝে শিল্প দেখেছিল ; নিপুন হাতে গড়েছিল মাটির তৈজসপত্র। পরবর্তীতে সে শৈল্পিক মন গ্রথিত হয়েছিল বংশ পরম্পরায় । কিন্তু অর্থনৈতিক বিবেচনায় পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী এ পেশা দিন দিন মূল্য হারাচ্ছে । কারণ শিল্পকারখায় যন্ত্র যেখানে অল্প সময়ে শত সহস্র পণ্য তৈরি করতে পারে সেখানে মনুষ্য সৃষ্ট ধীর লয়ে গড়ে তোলা মাটির জিনিসের কদর কোথায়? হরিনারায়ণ পালদের শরীরের ঘামে ঝরে ঝরে পড়া দুঃখ কষ্টের তরল বিন্দুগুলোর মূল্য টাকায় নিরূপণ করা যায় কি ? কালের আবর্তে মূল্যহীনতা জেনেও এ শিল্প আঁকড়ে বাঁচার প্রাণান্তকর অপচেষ্টা হরিনারায়ণ পালের । কারণ সেই শৈশব থেকে তিনি এ কাজকে মন থেকে ভালোবেসেছেন , জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছেন । এত বছরের পেশাটিকে অবেলায় এসে ছাড়বেন কেমন করে ?  "মৃৎপুরের হরিনারায়ণ পাল " নামক গল্পটায় ঘটনার ঘনঘটা নেই । কেন্দ্রীয় চরিত্র হরিনারায়ণ পালের অন্তর্জগতের মনোবেদনার যে শিল্পিত বর্ণনা লেখক দিয়েছেন - তা-ই গল্পটার প্রধান উপজীব্য বিষয় কিন্তু এটাই পাঠককে গল্পের শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবে । মনে দাগ কেটে আছে হরিনারায়ণ পাল- এর বলা একটি কথা " মানবজীবনে বইপত্র-জ্ঞান-বিজ্ঞান - কলা- কৌশল কোনোটাই শেষ কথা বলতে পারে না - সম্ভব নয়। এই সবকিছুকে হজম করেও নিজস্ব বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছে মানুষের জীবন ।" - কী গভীর জীবনবোধ ! 
 
জলের ভাষা বুঝে জলে বিচরণের রোমাঞ্চকর নেশা যার নেই সে জলজীবী হতে পারে না । এ নেশা যার আত্মায় মিশে যায় - তার নদীটি যদি কেউ কেড়ে নিয়ে যায় অন্যায়ভাবে ? নদীর সাথে মিশে যাওয়া আত্মা ও জীবন জীবিকার কী হবে? বাঁধের কারণে ও নাব্যতা হারিয়ে শুকিয়ে যাওয়া নদী জলের হাহাকারে ফেটে চৌচির হয়ে জলজীবিদের হয়ে আর্তনাদ করে । অবৈধভাবে খাল-বিল-নদী দখল করে ভূমিদস্যুরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় অথচ জলজীবি কেষ্টরা ঝিনুক সমান পানির দখলও পায় না । দিনের পর দিন না খেয়ে থাকতে থাকতে মনটাও বুঝি শুকিয়ে যায় - সে মনে না থাকে নীতি , না অনুভূতি । " নদী ও মানুষের গল্প" নামক গল্পে কেন্দ্রীয় চরিত্র জলজীবী কেষ্ট- এর শত কষ্ট সয়ে অসহায় আত্মসমর্পণের চিত্র পাঠকমনে ক্ষত সৃষ্টি করতে বাধ্য । লেখকের জাদুকরী মোহাচ্ছন্ন ভাষায় বর্ণিত কেষ্টর আত্মসমর্পণের শেষ বাক্যটি আমার ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয় বারবার - " কইয়া দে ওই পুংটারে - আমি রাজি...."
 
'খুন করা যায় না' ও 'স্বপ্নবাড়ির কুসুম' নামক গল্প দুটিতে শিক্ষিত ও ধন্যাঢ্য শ্রেণির নৈতিকস্খলনের চিত্র। "খুন করা যায় না" গল্পে গৃহকর্তা অসহায় তার শারিরীক রিপু তাড়নার কাছে - যার বলী হয় গ্রাম থেকে আগত কিশোরী আলেয়া । রিপুর তাড়নায় গুণবতী স্ত্রীকে উপেক্ষা করে নিজ বিবেক জলাঞ্জলি দিতে হয়েছে তাকে । যে রিপু শুধু তাকে অমানুষ করে ক্ষান্ত হয়নি - অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে কিশোরী আলেয়ার দেহ-মন । পেটের দায়ে আনন্দমুখর উচ্ছ্বল কৈশোর জীবন বর্জন করে গুলশানের আলিশান বাড়িতে চার দেয়ালের ভেতর বন্দি হলো কিশোরী আলেয়া - শরীরটাকে দাস বানাতে পারলেও যার মনোজগত দাসত্ব মানেনি । সে অসহায় হলো স্বাধীন উচ্ছ্বল গ্রাম্য জীবনের সেই সংকীর্ণ ব্রহ্মপুত্র নদী, নয়ার চর, ঝাউবন, কাশবন, বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের কাছে । শিক্ষিত গৃহকর্তার কদর্য কাজ ও আলেয়ার জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ সময়টাকে লেখক বর্ণনা করেছেন এভাবে - 'এক সময় আছাড়ি পাছাড়ি করতে করতে আলেয়া দেখল - ঝাউবনের ভেতরে ঢুকে পড়া আজদাহা সাপটা তার নিথর ছোটো শরীর পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শ্বাস রুদ্ধ করে ফেলছে - তার বিশাল হা -এর ভেতর টেনে নিচ্ছে যেভাবে পুটুলীর মার ছাগলটাকে টেনে নিয়েছিল - এরপর মনে হল সে মরে যাবে - মরেই যাবে !' অসাধারণ একটি গল্প এটা । গল্পের বিভিন্ন স্থানে জাদুবাস্তবতার আশ্রয় আছে । বহুদিন যাবৎ জাদুবাস্তবতা আশ্রিত গল্প নিয়ে আমার মনে একটা প্রশ্ন ছিল - গল্পের ধরন যেহেতু জাদুবাস্তবতা তো গল্পে জাদুর সাথে বাস্তবতার সংযোগটা কোথায়? দুটো তো পরস্পর বিরোধী বিষয় । তো জাদু ও বাস্তবতা কী করে মিলেমিশে জাদুবাস্তব গল্প হয়ে ওঠে? কথাশিল্পী ইউসুফ শরীফ- এর গল্প পড়ে আমার সে প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়েছি । কথাসাহিত্যিককে আমি জাদুবাস্তবতা আশ্রিত গল্পের কারিগর ও শিক্ষক মানতে বাধ্য হয়েছি । 
 
কথাসাহিত্যিকের অসাধারণ এক সৃষ্টি 'স্বপ্নবাড়ির কুসুম' নামক গল্পটি । এ গল্পে লেখক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষিত সমাজের ক্ষমতা ও টাকার লোভের কাছে অসহায়ত্বের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরেছেন । এসব মোহ শিক্ষিত সমাজের কিছু মানুষকে কী করে পথভ্রষ্ট করে নীতিবিবর্জিত করে তোলে তার অসাধারণ চিত্র উঠে এসেছে । কী করে নিজের শিক্ষিত, সুন্দরী ও সংসারী স্ত্রীকে 
 
অসাধারণ একটি গল্প "আচানক এইসব দৃশ্য"। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ । জগতের সকল কিছুর মাঝে সেরা । সেই মানুষকে পশুর হিংস্রতার সাথে তুলনা করে পশু বলতে বোধ করি সবারই কষ্ট হয় ভেতরে ভেতরে । কিন্তু  দিন দিন সেরা জীবটির হিংস্রতা বুঝি পশুকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে । এমনি মূলভাব নিয়ে রচিত গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছি । কতটা অসহায় বোধ করলে গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মালেক বলতে পারে -" গভীর জঙ্গলে চইলা যাইবাম - জন্তু জানোয়ারের লগে বসত করবাম " তা অনুভব করে মনটা ভারাক্রান্ত হয়েছে । এখানেই তো কথাশিল্পীর সার্থকতা - নিজের দেখা ভুবনের দুঃখ কষ্টগুলোকে পাঠকমনে ছড়িয়ে দিয়ে নতুন করে ভিন্ন আঙ্গিকে ভাবাতে বাধ্য করা । 
 
"বুনোরাত" গল্পটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত এক নারীকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে । গল্পটির রচনাকাল আজ থেকে বহুবছর আগে ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে । কিন্তু এ গল্প সব সময় সব যুগের পাঠককে নাড়া দেবে । লেখকের প্রতিটি গল্পের বিষয় ও উপস্থাপন সময় কালকে ছাপিয়ে ভিন্ন আবেদন রাখতে সক্ষম পাঠকমনে । গল্পগুলো কখনও হারাবার বা বিস্মৃত হবার নয় । 
 
এ গল্পগ্রন্থের  "এক লাইলীর প্রতিকৃতি" গল্পটি সবচেয়ে ভালো লাগার গল্পের একটি । আগেই লিখেছি কথাসাহিত্যিকের জীবনবোধ গভীর । সমাজের অবহেলিত ও অসহায় মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের অনিয়ম ও অন্যায় তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবায় । প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে তিনি শৈল্পকতাকেই আশ্রয় করেছেন । লাইলীর হয়ে সমাজের প্রতি কঠিন এক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন - কেন ধর্ষক উপেক্ষা করে ধর্ষিতাকে নিয়ে খবর হয়? তাকেই সইতে হয় যত সমাজ আরোপিত লাঞ্ছনা ? শান্তশিষ্ট লাজুক লাইলীরা কতটা আঘাত পেলে সাংবাদিকদের বলতে পারে " যান আমারে কেউ কিছু করে নাই - কিচ্ছু অয় নাই আমার ! " লাইনটিতে একই সাথে নিপুনভাবে লাইলীর ঘুরে দাঁড়াবার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও আছে । দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে সামনে আগানোর মন্ত্র ও শক্তি এই লাইলীরাই জানে । 
 
'প্রান্তিকজনের গল্প' গল্পগ্রন্থটির বাকি গল্পগুলো নিয়েও বিস্তর আলোচনা করা যাবে । তবে আমি এখানেই ইতি টানছি । পরিশেষে এটুকু বলব - কথাসাহিত্যিক ইউসুফ শরীফ সাহিত্য জগতের মাঝে একটি উজ্জ্বল সাহিত্যজ্ঞান দরজা । যে দরজার ভেতর প্রবেশ করলে পাঠকমন আলোড়িত ও আলোকিত হতে বাধ্য - যদি কেউ কথাশিল্পীর গল্পগুলো একবার মনোযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করে তবেই সন্ধান পাবে এ জ্ঞান দরজার নতুবা নয় । এ কথাশিল্পীর গল্পগুলো নতুন প্রজন্মের আরও আরও পাঠকের কাছে পৌঁছান প্রয়োজন । নতুবা এমন একজন কথাশিল্পীর কথা অজানা থেকে যাবে এ প্রজন্মের বহু পাঠকের কাছে - যাদের এ জ্ঞানের ছায়াতলে এসে আলোটুকু কুড়িয়ে নেয়া খুব প্রয়োজন ।


অলংকরণঃ তাইফ আদনান