জলধি
/ গল্প
/ হয়তো আবার দেখা
হয়তো আবার দেখা

সকাল দশটায় ফ্লাইট মিথিলার ঢাকায় যাবে।তাই বসে আছে প্লেনের অপেক্ষায় মিথিলার স্বামী অনন্ত-ও তার পাশে।একটু পরেই মিথিলা চেকিং এ চলে গেলে সে চলে যাবে নিজের কাজে।মিথিলাকে অনন্ত একা ছাড়তে চায়না। যেনো প্রতিটি মুহুর্ত আগলে রাখতে চায় নিজের মাঝে।তবু মাঝে মাঝে নিজের মনের বিরুদ্ধে ছাড়ে।তাদের বিয়ের বয়স প্রায় পঁচিশ বছর।তবুও যেনো মিথিলা অনন্তের কাছে নতুন সেই মিথিলাই রয়ে গেছে। মিথিলাও একা কোথাও যায়না অনন্তকে রেখে খুব প্রয়োজন না হলে।
মিথিলা চেকিং এ ঢুকে গেলে অনন্ত বিদায় নেয় এয়ারপোর্ট হতে।আরো কিছু সময় বাকী হাতে মিথিলার।বসে আছে লাউঞ্জে মিথিলা, মুখে মাস্ক তবে তা খোলা অবস্থায় মোবাইল ঘাটছিলো।আজ-কাল মোবাইলে এত নতুন নতুন নিউজফিড থাকে, তাই খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো।হঠাৎ অজানা কন্ঠের আওয়াজে সে সম্বিত ফিরে পেলো।কেও একজন চিৎকার করে কথা বলছে।
-ফারুক যে, কখন এলে, কি খবর তোমার?
অনেকদিন পর, ভালো আছো?
বেশ উচ্চস্বরে কথা গুলো বলছে ভদ্রলোক।
এতো উচ্চস্বরে কথা গুলো কানে যেতেই মিথিলা ফিরে তাকালো ভদ্রলোকের দিকে।
একি! মিথিলা একেবারে অপ্রস্তুত।
এ যে বাবু!মিথিলা ভদ্রলোককে দেখতেই মাস্ক পরে ফেললো ও সানগ্লাসটা পরে নিলো তাড়াহুড়ো করে।
কত বছর পর দেখলো বাবুকে।
তাও প্রায় ২৭/২৮ বছর হবে।
ভদ্রলোক, মানে বাবু অবশ্য খেয়াল করেনি মিথিলাকে।
এই ভদ্রলোকের সাথে কোন একসময় মিথিলার একটা সুক্ষ্ম ভালোলাগার সম্পর্ক তৈরী হলেও, সম্পর্কে গাঢ়তা পাবার আগেই কেটে গিয়েছিলো সুঁতো।তবুও,মিথিলা বা ঐ ভদ্রলোকের বেশ মনে আছে দুজন দুজনকে।
দুজন ফেসবুকেও যুক্ত আজো।
যদিও দেখা হয়নি এ-পর্যন্ত সেই সুঁতো ছেড়ার পর হতে।আজ এতো বছর পর মিথিলার পাশে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক মানে বাবু, ফারুখ নামে আরেকজনের সাথে গল্প করছে।
কি অদ্ভুত!বাস্তবতা।
আগেই বলেছি ভদ্রলোকের নাম বাবু।এটা অবশ্য তার ডাকনাম। ভালো নাম একটা আছে সেটা মিথিলার কাছে অতটা প্রয়োজনীয় না।বাবু নামে মিথিলা তাকে ডাকতো একটা সময়ে।
একটা সময়ে বাবুর প্রতি মিথিলার ভালোলাগা থাকলেও ভালোবাসা ছিলো কিনা,আজো প্রশ্ন আসে মনে তার।তবে প্রথম জীবনের প্রথম ভালোলাগা বিষয়টা সবসময়েই মনে রাখার। হয়তো সে কারনেই বাবুকে আজো ভুলেনি মিথিলা।একটা সময় তাকে চিঠি পাঠানো গিফট দেয়া বা তার সাথে ডেটে যাওয়া ব্যাপার গুলো থাকলেও,কেনো জানি কখনোই মনে হয়নি বা মনে রাখেনি মিথিলা। ভুলেই গিয়েছিল মিথিলা বাবু নামে কোন চরিত্র ছিলো তার জীবন।বাবুকে মিথিলা কখনো তেমন ভাবে ভালোবাসতে পেরেছে কিনা আজ যেমন অনন্তকে সে ভালোবাসে প্রশ্ন জাগছে মনে।তবে সে সময়ের মিথিলার পাগলামী ছিলো হয়তো বয়সের কারনে, হয়তো আবেগের।
বাবু তাকে কখনো ভালোবাসেনি এটা মিথিলা জেনে গিয়েছিলো সেদিনই, যেদিন মিথিলাকে সে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছিলো রাস্তায়।এক ধরনের খেলা খেলেছিলো বাবু, সে সময়ে।সেই খেলার পুতুল ভাবতে নিজেকে মিথিলা আজো কষ্ট পায়,আজো ঘৃনায় অপমানে মুচড়ে যায়।বাবুর, সেই খেলার পুতুল হওয়াতে মিথিলা মানসিক ভাবে ভেন্গে পড়ে সেদিন।তাই হয়তো বাবু নামটা বা বাবুকে সে কখনোই ভুলতে পারেনি, আজো মনে খোঁচা লাগে বাবুর কথাটা মনে এলে কেমন জানি একটা অপমানে মন ভরে উঠে মিথিলার।
তবে মিথিলা অনন্তের ঘরে এসে নিজেকে সবসময় ভাগ্যবতী মানে।সেদিন মিথিলার সাথে দেখা না হওয়াতে ভালোই হয়েছিলো বাবুর ।তাই হয়তো আজ অনন্তকে সে পেয়েছে জীবন সন্গি হিসেবে।অনন্তর মতো করে কেও তাকে এতো ভালোবাসা দিতে পারতো না পঁচিশ বছর ধরে অনুভব করছে মিথিলা।
নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বাসে অনন্ত মিথিলাকে।মিথিলার প্রতিটি চাওয়া যেনো অনন্তর কাছে এক বিশাল দায়িত্ব। তাইতো মিথিলা অনন্ত কে জীনি বলে ডাকে।অনন্ত মিথিলার প্রতিটি প্রয়োজনকে সন্মান করে মূল্যায়ন করে।মিথিলার কপালের ভাঁজ থেকে মনের কোনে বিচরণ করে অনন্ত।
তবুও! মনের কোনে কেমন জানি একটা বিব্রতবোধ কাজ করে বাবুর কথা মনে এলে।যদিও তার প্রতি মিথিলার কোন আবেগে ভালোলাগা কাজ করেনা ঘৃনা ছাড়া।তাই বেমালুম ভুলে গেছে। হঠাৎ সামনে আসাতে মনে পড়ে গেলো তার সেই অপমানের খোঁচাটা।খোঁচা টা আজো মিথিলাকে বিব্রত করে।বাবুর সাথে পরিচয় না হলেই ভালো হতো।
তবে এতো বছর পর এসবও এখন তুচ্ছ স্মৃতির গল্প মাত্র।সময়ের বাতাসে আসে আবার বিলূন হয়ে যা সময়ের সাথে।মিথিলা নিজের জীবনে সুখি হয়তো বাবুও।
আজ সেই বাবু মিথিলার পাশে দাড়িয়ে কথা বলছে।তার পরিবার সাথে।বউ আর দুই ছেলে সাথে। মিথিলা চেয়ারে বসে ভাবছে, কি অদ্ভুত দুনিয়া?বাবু তার দিকে দুবার তাকালেও চিনতে পারেনি মাস্ক আর সানগ্লাসের কারনে।আর এতো বছর পর এই অবস্হায় চেনার কথাও না।আবার এটাও বলা যা মিথিলাও নিজেকে দেখাতে চায়নি।
কি দরকার?পুরোনো সেতো এখন মুছে যাওয়া অতীতের স্মৃতি মাত্র। সামনে তার বর্তমানের ভালোবাসার হাতছানি আগামী আলোর সাথে।সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
হঠাৎ এনাউন্সমেন্ট এ জানালো প্লেন রেডি যাত্রী সব উঠে গেলো।আশ্চর্যের বিষয় প্লেনের আগে পিছে সীটে বাবু আর মিথিলা বসা।মিথিলা একা বাবু তার বউ এর সাথে পারিবারিক আলাপে মশগুল।তবে মিথিলা আজ আর ভাবে না কে আছে তার চারদিকে.....জানালার পাশে তাকিয়ে হাসলো আর ভাবলো এই তো জীবন।হয়তো আবারও এভাবে দেখা হবে বাবু মিথিলার।তবে অনন্তের প্রতি ভালোলাগা ভালোবাসার হাতছনি এখন বড় কাংখিত মিথিলার কাছে।প্লেন উঠে যাচ্ছে হাজার হাজার ফুট উপরে নীচে পড়ে রইলো সব।ঘন মেঘের দিকে তাকিয়ে মিথিলা হাসলো।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান