
দুপুর ঝিম মেরে আছে। গাছগাছালিতে পাখপাখালির ডাক-চিৎকার নেই। এরকম নির্বিকার দুপুর খুব কম চোখে পড়ে। ঠিক কবে এরকম দুপুর এসেছিল, যাকে বলে নিরাক-পড়া, মনে করতে পারছি না। এইসব দুপুরে শরীরে আবসাদ নেমে আসে; মন বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত; এমনকি কখনো-সখনো উশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। মন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। কোনো কাজে মন বসে না। কিন্তু আমি রান্না করছি। উঠোনের এককোণে কামরাঙাগাছের নিচে ছায়লা। ছায়লার পেছনের দিকে পাটখড়ির বেড়া, বাকি তিনদিকই খোলা। বাঁশের চাটাই-ছাওয়া ছায়লাটিকে আমি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করি। দুপুরে সাধারণত আমি রান্নাবান্না করি না। বাড়িতেই থাকি না দুপুরে, বলা ভালো, বাড়িতে আসা হয়ে ওঠে না; সুতরাং রান্নাবান্নার দরকার পড়ে না। সকালে দুটো ভর্তা-ভাত কিংবা ডিম বা পটলভাজি, যেদিন যা জোটে, তাই মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। অফিসে যাই। অফিস মানে ফ্যানের নিচে চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ না, কাজ মাঠে। ঋণের কিস্তি তোলা। এরচে’ বাজে আর কোনো কাজ নেই দুনিয়ায়। ঋণ নেয়ার সময় সবাই বলে, আশ^স্ত করে; নিয়মিত, সময়মতো বাড়িতে গেলেই কিস্তির টাকা দিয়ে দেবে। কিন্তু ঋণের টাকাটা হাতে পাওয়ার পর, দুচারটা কিস্তি সময়মতোই পরিশোধ করে; তারপরই শুরু হয় তালবাহানা। সকালে না দুপুরে, দুপুরে না বিকালে; আজ না কাল, কাল না পরশু, কলুর বলদের মতো ঘোরাতেই থাকে। আমিও তাদের পেছনে-পেছনে ঘুরতে থাকি। পাওনা সব কিস্তির টাকা না-নিয়ে অফিসে ঢোকার জো নেই। ম্যানেজারের যা খবিশ মুখ! লোকটার মুখ দেখতে যেমন বাঁদরের মতো, মুখ দিয়ে কথা যা বেরোয় তাও সবই যেন বাঁদরের বুলি। মাস শেষে কিস্তির পুরো টাকা লেজার বইয়ে জমা না-হলে বেতন থেকে কেটে রেখে দেবে। বেতনই বা ক’টাকা? মোটে নয় হাজার। এসএসএস কিংবা বুরো’র মতো বড়ো এনজিওর মাঠকর্মীদের বেতন আঠারো-বিশ হাজার টাকা। হবে না কেন? এসব এনজিওতে ঢোকার ন্যূনতম যোগ্যতা এইচএসসি পাশ। আমি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলাম। তারপরই তো বিয়ে হয়ে গেল। আর পড়তে পারিনি। ভাগ্যিস, গৌরবের বাবা ইডি সারের বন্ধুর মতো ছিল। দয়াপরবশ হয়ে, ছেলেটাকে নিয়ে যাতে পথে বসতে না-হয়, অন্তত খেয়ে-পরে বাঁচতে পারি, চাকরিটা আমাকে দিয়েছিলেন। সাত হাজার টাকা বেতনে ঢুকেছিলাম। এখন নয় হাজার। সে-যাই হোক, আমি ইচ্ছে করলে দুপুরে বাড়িতে এসে, আমার নিজের নিউনিয়নেই পোস্টিং, যে-দিন যে-গ্রামেই থাকি না কেন, দুটো ভাত ফুটিয়ে খেয়ে যেতে পারি, কিন্তু আসি না। ভ্যানিটি ব্যাগে দুমুঠ চিড়া আর একটু গুড় নিয়ে যাই, দুপুরে কোনো বাড়িতে বসে চিড়া ভিজিয়ে খেয়ে নিই। ক’দিন যাবত দুপুরে বাড়িতে এসে রান্না করি। গৌরব বাড়িতে যে! ছেলেটা যখনই বাড়িতে আসে, যতো কষ্টই হোক, দুপুরেবেলা হাঁটতে ইচ্ছা করে না, তবুও বাড়িতে এসে ওকে রান্না করে খাওয়াই...।
ভাত আর পটলভাজি হয়েছে। চুলায় তরকারি। সরু ফালি করে বেগুন কেটে তাই দিয়ে বাজিলা মাছের তরকারি রাঁধছি। বাজিলা মাছ গৌরবের খুব প্রিয়। ছেলেটার খোরাক একেবারেই অল্প। ভাত খেতেই চায় না। চব্বিশ বছরের লম্বাচূড়া, বাবার মতো লম্বা হয়েছে, জোয়ান ছেলে, পাতে দেড়-চামিচ ভাত দিলেই রা-রা করে ওঠে। অন্য মাছ কি মাংসও পছন্দ করে না। বাজিলা মাছের তরকারি হলে অন্তত দু’চামিচ ভাত খায়। কিন্তু বাজিলা মাছের যা দাম! শুধু বাজিলা মাছ কেন, চাল-ডাল, শাক-সবজি, ডিম-মাংস, তেল-চিনি, পেঁয়াজ-মরিচ-- কিছুতেই হাত দেওয়ার জো নেই, বাজার-সদাই করতে গেলেই হাত যেন পুড়ে যায়। অফিসের পত্রিকায়, বিকালে যখন কিস্তির টাকা জমা দিতে যাই, পড়ি তো, প্রায় প্রত্যেকদিনই বড়ো বড়ো লাল অক্ষরে ছাপা হয়-- বাজারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। অসাধু ও অসৎ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করেছে। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের ইচ্ছামতো, একদিন চালের দাম, একদিন ডাল কি তেল-চিনির দাম, মাছ-মাংসের দাম, যেদিন যেটার দাম বাড়ানোর ইচ্ছা মনে জাগে, বাড়তি দাম হাঁকে। ভোক্তার মাথায় বাড়ি পড়লেও কেউ বাড়ি ঠেকাতে পারে না। অসহায় তারা। অসৎ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট যেন সরকারের চেয়েও শক্তিশালী। সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে পারে না। ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটাই ভীষণ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, মান্যতা পেয়েছে। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী, বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী প্রতিদিনই সকালে ঘুম থেকে উঠে হুংকার ছাড়েন-- অচিরেই সিন্ডিকেট ভাঙা হবে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সিন্ডিকেট ভাঙে না। পৌজান বাজারে, কালীবাড়ি বাজারে, হদুপুর বাজারে, ভুক্তা বাজারে, চামুরিয়া বাজারে, ইছাপুর বাজারে-- চায়ের দোকানগুলো সরগরম-- আলোচনা একটাই, প্রায় সব চা-দোকানদারই আমাদের সেবা গ্রহিতা, কিস্তির টাকা তুলতে স্টলে-স্টলে যেতে হয়, বসতে হয়, কানে তুলো দিয়ে থাকলেও কানে আসে-- ব্যবসায়ীদের অবৈধ সিন্ডিকেট ভাঙবে কে-- অনেক মন্ত্রী-এমপি, হয়তো বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও, সরকারি দলের বহু নেতা সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। যা-হোক, সকালে বাজারে গেছিলাম, গ্রামের হাটখোলায় প্রত্যেকদিন সকালে বাজার বসে, দুধ-ডিম, মাছ-মাংস, শাক-সবজি; বিশেষ করে খাদ্যপণ্য প্রায় সবই বাজারে পাওয়া যায়। আমি খুঁজছিলাম বাজিলা মাছ। জগদীশ জাইলার ঝাঁকার ঢাকনার ওপর একভাগ বাজিলা মাছ ছিল। মাপলে একপোয়াও বোধকরি হবে না। দাম চাইল দু’শ’ টাকা। নয় হাজার টাকা বেতনের চাকুরে তৃষিতা বসাক একপোয়া মাছ দু’শ’ টাকা দিয়ে কী করে কেনে? কিন্তু আমাকে যে বাজিলা মাছ কিনতেই হবে, বাজিলা মাছের তরকারি আমার ছেলের খুব প্রিয়। জগদীশ জাইলা একটা পয়সাও কমে ছাড়লো না। তারপরও বাজিলা মাছ হোক, বাজার-পরিস্থিতি দেখে জিহ্বা বেরিয়ে আসার জো, কিন্তু কী করবো, ছেলের পছন্দ বাজিলা মাছ, কিনে নিয়ে এসেছি। বেগুন সহযোগে রাঁধছি। গৌরব নদীতে স্নান করতে গেছে। স্নান করে আসতে-আসতে আমার তরকারি হয়ে যাবে...।
হঠাৎ কোত্থেকে এসে গৌরব ছায়লার খুঁটি ঠেস দিযে বসল। কেঁপে উঠলো ছায়লা। অনেকদিন ছায়লার খুঁটি বদলানো হয় না। বাঁশের খুঁটি তো, মাটির নিচের অংশ হয়তো পচে গেছে। টাকার অভাবেই ছায়লার খুঁটি, ছাউনি কিছুই বদলাতে পারছি না। বৃষ্টি নামলে পানি পড়ে। গৌরবও জানে, ছায়লার জীবনীশক্তি ক্ষয় হতে হতে শেষ প্রান্তে চলে এসেছে, টিকে আছে এবছর ঝড় হয়নি বলে। ঝড়ের ঝাপটা লাগলেই ছায়লা মুখ থুবড়ে পড়বে। সব জেনেশুনে গৌরব ছায়লার খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসল? তার ঠেস খেয়েই ছায়লা যেভাবে কেঁপে উঠল-- ভেঙে যে পড়েনি হুড়মুড় করে, তাই তৃষিতা বসাকের ভাগ্যের জোর। ছায়লা এখন ভেঙে পড়লে তার আর উঠানোর জো নেই। টাকা-পয়সা, হাতে যা ছিল, সবই তার অসুখে গেছে...।
গৌরব উদ্ভ্রান্ত। ওর চোখের মণিদুটো জবাফুলের মতো লাল...।
গৌরবকে দেখে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। এ কী অবস্থা ছেলের! জিজ্ঞেস করলাম-- ‘কীরে গৌরব, তোকে এরকম উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে কেন? কী হয়েছে? স্নান করতে যাসনি...?
আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিল না গৌরব। সামনের বাঁশঝাড়ের দিকে পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলো। বাঁশঝাড়ে ঝুলছে কিছু বাদুড়। ওর রক্তাভ চোখ যেন বাদুড়গুলোর ওপর...।
আমি ভয় পেলাম বটে, কিন্তু অনুমান করতে বাধা ছিল না, কারণ, বলতে গেলে আমি তো সব জানি, গৌরব কেন হঠাৎ এরকম উন্ত হয়ে উঠেছে। দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে। গৌরব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। তৃতীয়বর্ষ। হয়তো গৌরব নিজেও আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিল। রাতে খবর এসেছে, ওর বান্ধবী কান্তা ফোন করেছিল, ওদের এক বন্ধু পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে। গৌরব সকালে ঢাকা যেতে চেয়েছিল। আমি যেতে দিইনি। গৌরব ছাড়া দুনিয়ায় আমার যে, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্বামী কেউ নেই। গৌরবের বাবা খুন হওয়ার ক’দিন পরই ভাসুর তার বউ-বাচ্চা নিয়ে দেশ ছেড়েছে। ছোটভাই, বোন, বোনপোকেও সাথে নিয়ে গেছে। বাড়িতে এখন গৌরব আর আমি। গৌরব আমার অন্ধের যষ্ঠি। এখন, এই অগ্নিউত্তপ্ত ঢাকায় গেলে, বলা তো যায় না, কিছু একটা যদি হয়ে যায় ওর...!
দুই
আমি বড়ো হয়েছি বাংড়া, মামার বাড়ি। বাংড়া উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর, তখন বর্ষার দিন, দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা চলছিল, মামারা আমার বিয়ে দিয়ে দিল। বাংড়া থেকে দু’তিন গাঁ দক্ষিণে হদুপুর। আমি হদুপুরের কমল বসাকের বউ...।
আমাদের বাড়ি ছিল নেত্রকোণার বারহাট্টা। ভাগ্যের ফেরে পড়ে, ভগবান হয়তো লিখে রেখেছিল, মা আমাকে আর আমার ছোটভাই সংকরকে নিয়ে বাংড়ায় ভাইদের বাড়িতে এসে উঠেছিল। নিজেকে বাঁচানো, সন্তান দু’টোকে খাইয়ে-পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখা, শ্বশুরবাড়িতে পরিবেশটা এমন হয়ে উঠেছিল, ভাইদের কাছে চলে আসা ছাড়া মা’র আর কোনো উপায় ছিল না। মামাবাড়িতে যে আমরা খুব সুখে ছিলাম, কোনোভাবেই তা বলার জো নেই, চিরকুমার বড়ো মামা অরুণ বসাক না-থাকলে হয়তো মামাবাড়ি থেকেও উৎখাত হতে হতো, আশ্রয়চ্যুত হয়ে পথে বসতে হতো, তা হয়নি; বেঁচে ছিলাম, লেখাপড়াও কিছু করেছি, এখনো বেঁচে আছি আমার গৌরব আছে...।
বারহাট্টায় যৌথ পরিবারে আমার মা ছিল কনিষ্ঠবধূ। বড়ো দুই জা। বাড়িতে নয়টি তাঁত। চড়কায় সুতা কাটা, রঙ গোলা, সুতায় রঙ দেয়া, রোদে শুকানো-- এসব কাজ তো করতই মা, বাড়ির লোকদের জন্য, তাঁতের শ্রমিকদের জন্য রান্নাবান্না, থালা-বাটি-ঘটি মাজা, চুলার ছাই ফেলা-- সবই তাকে করতে হতো। বড়ো দুই জা তাঁতের টুকিটাকি কাজ করে দিন পাড়ি দিত। গেরস্থালি কাজে, কুটাটায়ও হাত দিত না। অল্প বয়সেই, বয়স তেরো কি চৌদ্দ হবে তখন, মার বিয়ে হয়েছিল। বাড়ির কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠতো কিন্তু মুখে কোনো রা-শব্দ ছিল না। মা তো জানতো, বুঝতো-- কেন তার ওপর এতো কাজের চাপ। সারাদিনে সামান্য সময়ের জন্য তার ফুরসত মেলে না। তারপরও কোনো কাজে কিঞ্চিৎ এদিক-সেদিক হলেই, যেমন-- ঘটি-বাটি আজ চকচক করছে না কেন, বাটিতে মুখ রাখলে আয়নার মতো মুখ চেখা যায় না কেন-- মা যেন ঘটি-বাটি, থালা-বাসন মন দিয়ে ভালো করে মাজেনি, বড়ো দুই জা’র বকাঝকা শুনতে হতো; বাবা যে বাড়ির কোনো কাজে হাত দেয় না, তাঁতে বসে না...!
আমার বাবা ছিল বাউল-ধরনের মানুষ। বসাকবাড়ির জোয়ান ছেলে, বিয়ে করেছে, দুদিন পর বাচ্চাকাচ্চার বাবা হবে, অথচ দেখো, কেমন বাউল-সাধুদের সাথে দেশ-দেশান্তরে ঘুড়ে বেড়ায়। সাতদিন, দশদিন; কখনো-কখনো পনেরো-বিশদিন তার কোনো খোঁজ থাকতো না। একদিন রাতে চুপিচুপি বাড়ি এসে মা’র ঘরের দরজায় টোকা দিত। এই টোকার শব্দ মা’র কাছে পরিচিত। দুটো টোকা পড়তেই দরজা খুলতো মা। দরজা খুলে দিয়ে বিছানায় উপুর হয়ে পড়ে মা ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদতো। মা জানতো না কবে তার এই কান্না শেষ হবে। তারপরও, বাবা যখন বাড়ি থাকতো না, মা অর্ধেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতো, ঘুমাতো না, যদি লোকটা এসে ঘরের দরজায় টোকা দেয়! মা বাবার ঘরের দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শোনার অপেক্ষা করতো। এসব মা’র মুখেই শুনেছি...।
এভাবে দিন যায় না। গেরস্থালি, ঘরসংসার চলে না। বসাকবাড়ির ছেলে, তাঁতে বসবে না, কাজকর্ম করবে না, লালন ফকিরের ভক্ত হয়েছে, দেশে-দেশে সাধুসঙ্গ করে বেড়ায়, নিজেও গান বাঁধে, সুর করে; সংসারের একটা আপদ; এভাবে চললে বড়ো ভাইয়েরা তার বউ-বাচ্চাকে খেতে-পরতে দেবে কেন? মা’র কাছে শুনেছি-- তখন আমার বয়স তিন, সংকরের এক, দুধের বাচ্চা; একরাতে, বাবা সেদিন বাড়িতেই ছিল, দিন-দুয়েক আগে পূর্ণিমা গেছে, আকাশে কাঁসার থালার মতো গোল চাঁদ, জোছনা চুয়ে-চুয়ে পড়ছে আমাদের ঘরের চালে; এরকম জোছনা-রাতে বাবার মাথায় ভর করে লালন সাঁই; বাবা ঘরের চৌকিতে বসে চোখ বুজে দোতরায় সুর তুলে গুণগুণ করছে-- খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়-- আমার দুই জেঠু এসে বাবাকে ঘর থেকে ডেকে বের করলো। গীত-সাধনা বন্ধ রেখে বের হতে হয়েছে, বাবার মন খুব খারাপ। বিষণ্ন মুখে দাদাদের সামনে দাঁড়িয়ে রাইল। বড়ো জেঠু বলল-- ‘অবিনাশ, তোকে পৃথক করে দিলাম। কাল থেকে পৃথকান্ন খাবি। সকালেই হাঁড়ি-পাতিল, ঘটি-বাটি, থালা-বাসন যা আছে ভাগ করে দেবো। তিনটে তাঁতও পাবি। তুই দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াবি, তোর বউ-বাচ্চাকে আমরা খাওয়াবো, পরাবো-- তা হবে না। কোমরে টান পড়লেই, দেখবি সংসারী হয়ে যাবি...।
বাবা একটা কথাও বললো না। বড়ো দুই ভাইয়ের সামনে যেভাবে বোবার মতো দাঁড়িয়ে ছিল, বোবার মতোই ঘরে ঢুকে দরজা টেনে দিল। ঘরের ভেতর থেকে মা সব শুনেছে। সেও কিছু বললো না। ভগবান তাদের ললাটে কী লিখে রেখেছে, সেই জানে। এই লোকটাকে কিছু বলে লাভ নেই। এতক্ষণ জোছনাকীর্ণ ছিল ঘরদুয়ার। বাড়ির পাশের পুকুরের জল ঝলমল করছিল জোছনা পড়ে। কিন্তু হঠাৎ কোত্থেকে একখ- আগ্রাসী কালো মেঘ এসে চেপে বসল চাঁদের ওপর। বারহাট্টায় সমস্ত চরাচর অন্ধকারে ডুবে গেল...।
জেঠুরা ভেবেছিল-- পৃথক হাঁড়ির ভাত খেলে অবিনাশ সংসারী হবে। কিন্তু বাবা সংসারী হলে তো? বাবা-জেঠুদের পূর্বপুরুষ কেউ হয়তো সংসারবিবাগী বাউল ছিল, হয়তো তার নামটি এখন বিস্মৃত, তবুও দেখো, তাঁর অবিনশ্বর আত্মাই হয়তো ভর করেছে বাবার ওপর। ভাতের হাঁড়ি, থালা-বাসন পৃথক হলো বটে, কিন্তু আমাদের যে-বাবা সেই বাবাই রয়ে গেল। সংসার তাকে বাঁধতে পারলো না...।
তিনটি তাঁত। একটিতে বসলো মা। বাকি দুটোতে দুই শ্রমিক-- সুবল আর ইনছু কাকা...।
বাবা কখনো বাড়িতে থাকে, কখনো থাকে না। পূর্ববৎ। মায়ের বয়স বাড়ে খুব দ্রুত। আমি আর সংকর বড়ো হই। এভাব্ েদু’বছর কেটে গেছে। মা কিছু লেখাপড়া জানে। মায়ের হাতেই আমার হাতেখড়ি হয়েছে। সামনের জানুয়ারি মাসে আমি ছ’য়ে পা দেবো। তখন স্কুলে যাবো। একরাতে, বাবা সেদিন বাড়ি নেই, আমি মা’র কাছে পড়তে বসেছি, ‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল’-- পড়ছি, মা বললো-- জানিস তৃষিতা, তোর বাবা যে গান লেখে না, একটা গানে নাকি দেশে খুব সাড়া পড়েছে...।
আমার বয়স ছয় ছুঁইছুঁই কেবল, কী আর বুঝি, তবুও মা এটা-সেটা নিয়ে আমার সাথে কথা বলে। বাড়িতে মা’র কথা বলার মতো কোনো লোক নেই। সুবল আর ইনছু কাকার সাথে কি আর মন খুলে সবকথা বলা যায়। পৃথক-অন্ন শুরুর আগে, জেঠিমারা মাকে যতোই বকাঝকা করুক, মা তবুও তাদের সাথে কথাবার্তা বলতো। এখন জেঠিমারা মাকে দেখলেই তাদের মুখ কাছিমের মতো গলার ভেতর ঢুকিয়ে ফেলে। আমি বললাম-- ‘কোন গানটা, মা...।’
ওই যে, এরশাদকে নিয়ে লেখা-- ‘এরশাদ তুই স্বৈরাচার-- তোর হাতে রক্ত কার-- দেশবাসীর, দেশবাসীর...।’
আমার বয়স কম, তেমন কিছুই বুঝি না, তা ঠিক; বাবা কেন এরশাদকে নিয়ে গান লিখেছে, এরশাদ যে দেশের প্রেসিডেন্ট, তা জানি, মার মুখেই শুনেছি; কিন্তু তাকে নিয়ে বাবা কেন গান লিখল, তার হাতে কীভাবে দেশবাসীর রক্ত এলো, তা বুঝি না। বাবাকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। বাবাও আমার সাথে, যখন বাড়িতে থাকে, গল্প করে...।
একদিন বাবা বললো-- সারাদেশে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এখন তুঙ্গে। পদত্যাগ তাকে করতেই হবে। জেলেও যেতে হবে...।
বাবা কথা বলছিল মা’র সাথে। আমি কাছেই ছিলাম। বাবাকে বললাম-- পদত্যাগ কী বাবা? এরশাদকে জেলেই বা যেতে হবে কেন...?
‘এখন তুই বুঝবি না, মা। বড়ো হলে বুঝবি...।’ বাবা বললো।
এরমাদ জেলে গেল ঠিকই, কিন্তু বাবা তা দেখে যেতে পারলো না। ডিসেম্বরের ৬ তারিখে এরশাদ পদত্যাগ করে, তার আগেই, ডিসেম্বরের ১ তারিখ সকালে আমাদের বাড়ির পুকুরেই ভেসে ছিল বাবার লাশ। বাবাকে গলাটিপে খুন করা হয়েছিল, নাকি বাবা আত্মহত্যা করেছিল; সংসারের হাল ধরেছিল মা, আমাদের মানুষ করছিল মা, বাবা কোন দুঃখে আত্মহত্যা করতে যাবে-- এই প্রশ্ন সেদিন জেগেছিল আমার কচি মনে, কিন্তু বাবার মৃত্যু খুন কি আত্মহত্যাজনিত-- এর মীমাংসা হয়নি কোনোদিন। অবশ্য, অনেকদিন পড়ে, তখন আমরা মামারবাড়ি থাকি, আমি নবম শ্রেণিতে উঠেছি, মা বলেছিল-- চেয়ারম্যান নিজে লোক দিয়ে তোর বাবাকে খুন করিয়েছিল। চেয়ারম্যান ছিল এরশাদের দলের পা-া। আর তোর বাবা তো এরশাদের বিরুদ্ধে গান লিখেছিল, এরশাদবিরোধী সমাবেশে গান গাইতো-- ‘এরশাদ তুই স্বৈরাচার-- তোর হাতে রক্ত কার-- দেশবাসীর, দেশবাসীর’-- তোর বাবার এই গান শুনলে নাকি, আমি খবর পেয়েছিলাম, চেয়ারম্যানের চান্দিতে রক্ত উঠে যেতো...।
মার কথা শুনে আমার মনে পড়ে-- সেদিন পুলিশ এসেছিল, কিন্তু চেয়ারম্যান তাদের কী বললো, তারা লাশের কাছেও গেল না, ফিরে গেল। তারপর চেয়ারম্যানের উদ্যোগেই তড়িঘড়ি পুকুরপাড়েই চিতা সাজিয়ে বাবার লাশের সৎকার করা হলো। লাশের ময়নাতদন্ত করলে যদি বেরিয়ে আসে, অবিনাশ বসাক খুন হয়েছে। তাকে গলাটিপে মারা হয়েছে। তখন পুলিশ কাকে ছেড়ে কাকে ধরবে, কার নাম আসবে, কে জানে...!
বাবার মৃত্যুর পর আমরা বারহাট্টার অথৈ হাওরে পড়ে গেলাম। হাওরের কূলকিনারা নেই। আমরা হাওরের জলে হাবুডুব খাচ্ছি, হাতের কাছে একটা খড়কুটো নেই যে তাই ধরে বাঁচার চেষ্টা করবো, তখন জেঠুদের প্রকৃত চরিত্র ফুটে উঠতে লাগলো। একদিন সকালে, মা কেবল তাঁতে বসেছে, সুবল কাকা-ইনছু কাকা আগেই বসেছে তাঁতে, বড়ো জেঠু বললো-- ছোটবউ, তোমরা তো আর তাঁতে বসতে পারবে না...।
জেঠুর কথা শুনে মা তো হতভম্ব। ‘কেন দাদা! কী হয়েছে? তাঁতে বসতে পারবো না কেন...?’
অবিনাশ আমার কাছ থেকে দু’বছর আগে ত্রিশ হাজার টাকা নিয়েছিল। সে-টাকা তো আর শোধ করে যেতে পারলো না। ভগবান তাকে নিয়ে গেল। এখন, যা দেখছি, তুমিও টাকা পরিশোধ করতে পারবে না। তাহলে হিসাব তো সোজা, তাঁত তিনটে আমার হয়ে গেল...।
মেজো জেঠু বললো-- তোমরা এখন আর বাড়িতেও থাকতে পারবে না, তৃষিতার মা...।
বাড়িতে থাকতে পারবো না! আমার স্বামীর ভিটে, সন্তান নিয়ে সেখানে থাকার অধিকার আমার নেই...?
না, অবিনাশ অনেকদিন আগে, তা ছ’সাত বছর তো হবেই, আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়েছিল। তোমার গয়নাগাটি যা আছে, সব বিক্রি করেও তো অতো টাকা হবে না। ভিটেবাড়িটাই আমার দখলে নিয়ে নিই...।
বড়্দা! ছোড়্দা! আপনারা কী বলছেন এসব? আপনাদের কাছ থেকে টাকা তৃষিতার বাবা ধার নিয়েছে, আমি তো কিছুই জানি না...।
‘টাকা তো তোমাকে জানিয়ে নেয়নি...।’ বড়ো জেঠু বললো।
‘দেশে-দেশে ঘুরে বেড়িয়েছে, টাকা লাগেনি...?’ মেজো জেঠুর গলা।
মা বললো-- ‘লোকটা বেঁচে থাকতে টাকার কথা কিছুই বলেননি তো আপনারা...।’
‘হাজার হলেও অবিনাশ আমাদের ছোটভাই। ভেবেছিলাম, একদিন সুমতি হবে, তাঁতে বসবে, ওরও টাকা হবে, তখন দিয়ে দেবে। এখন আমাদের ভাইটাই নেই, কার জন্য টাকা ফেলে রাখবো...?’ বললো বড়ো জেঠু।
মেজো জেঠু আর কিছু বললো না। যা বলার তা তো তার বড়দা বলেই দিয়েছে। অবিনাশ বেঁচে থাকলে একটা কথা ছিল। অবিনাশ যেহেতু বিনাশ হয়ে গেছে, তবে আর বাড়িতে জঞ্জাল রেখে কী লাভ...?
তিন
বারহাট্টার যৌথ পরিবারে মা দাসিবাঁদির মতো খাটতো। সারাদিন পরিশ্রম যতোই হোক, শরীর-মন বিদ্রোহ করুক, মা মুখ ফুটে কিছু বলতো না। আসলে সংসার-সম্পর্কে অনভিজ্ঞ মা’র বড়ো দুই জা কি ভাসুরদের সামনে কিংবা তাদের মুখের ওপর কোন কথা বলা, তা যতো কষ্টেরই হোক, বলার মতো সাহস ছিল না। স্বামী সংসারের কোনো কাজে লাগে না, কী বলতে কী হয়ে যাবে, সংসারে লঙ্কাকা- ঘটে যেতে পারে, মা সর্বক্ষণ এই সংশয়ে থাকতো। কিন্তু যখন বাড়িতে পৃথকান্ন চালু হলো, এখন নিজের সংসার, মা দিনরাত গাধার মতো খাটতে লাগল। তিনটে তাঁত চালু রাখা, গেরস্থালি সব কাজ, আমাদের দু’ভাই-বোনের খাওয়া-দাওয়া, যত্ন-আত্ত-- মা একহাতে সব সামাল দিত। নিজের সংসার যে! যেভাবেই হোক, দাঁড়াতে হবে। ঈশ্বর নিশ্চয়ই কৃপা করবেন...।
বাবা হয়তো, পৃথক সংসার হওয়ার পরও, এই দু’চারদিন বাড়িতে আছে, তারপর সাতদিন-দশদিন কি পনেরদিন বাবার আর খোঁজ নেই, হঠাৎ একদিন রাতে ঘরের দরজায় টোকা দিল, মা তো এই টোকা শোনার অপেক্ষায়ই থাকতো; মা কিন্তু বাবার সাথে মন কষাকষি কি ঝগড়াঝাটি করতো না। বাবা বাড়িতে এলেই মা ভালোমন্দ যাই হোক, খাওয়ার জোগাড়ে ব্যস্ত হয়ে পড়তো...।
সংসার চালাতে গিয়ে, একা একটা মেয়েমানুষ, মার কতো কষ্ট হতো, কিন্তু মা যে বাবার সাথে রাগ-অভিমান, ঝগড়াঝাটি করতো না, এর পেছনেও একটা কারণ ছিল। মা গান খুব ভালোবাসতো। আমার দিদিমা’র গানের খুব সুন্দর গলা ছিল। সে নাকি চমৎকার ভাওয়াইয়া গান-- ওকি গাড়িয়াল ভাইরে-- আধুনিক অনেক গান-- দেশাত্মবোধকগান গাইতো পারতো। দিদিমা’র গুণ পেয়েছিল মা। বহুগানের সুর তোলা ছিল তার গলায়। আর বাবা গান-পাগল মানুষ। মা, বাবা যতোই উড়নচণ্ডি হোক, তাকে মনপ্রাণ ঢেলে ভালোবাসতো। সামান্য একটু ফুরসত পেলেই মা গুণগুণিয়ে গলা ঝালাই করতো। বাবার গান শুনে-শুনে লালন ফকিরের অনেক গানই মা তার গলায় তুলে ফেলেছিল। ‘অবোধ মন তোরে আর কী বলি/ পেয়ে ধন সে-ধন সব হারালি’-- লালনের এই গানটি ছিল মার খুব প্রিয়। গুণগুণিয়ে এই গানের সুর তুললেই বাবা মাকে বলতো-- নন্দিতা, আমি অবোধ। তোমাকে পেয়েও হারাতে বসেছি...।
মা কোনো কথা বলতো না...।
ভাইয়েরবাড়ি এসে মা আবার দাসিবাঁদিই হয়ে গেল। ছোট মামির। বসাকবাড়িতে কাজ তো কম না। জাত ব্যবসার কাজ, ঘরগেরস্থালির কাজ-- মা সেই ভোরে উঠে কোনোমতে স্নান-আহ্নিক আর তুলসীতলার পূজাটা সেরে কাজে লেগে যেতো। হাঁড়ি-পাতিল, ঘটি-বাটি, থালা-বাসন-- বারহাট্টা শ্বশুরবাড়ি যেমন সবকিছু ঘষে-মেজে সাজিয়ে রেখে রান্নাবান্নার কাজে লেগে পড়তো, এখানেও তাই। শ্বশুরবাড়িতে, আমরা দুই ভাই-বোন জন্মের পরও, মা ছিল অপরিপক্ক, এখন কিন্তু তা না, সব বোঝে। বড়ো জায়েদের বকাঝকা, মুখ ঝামটা তবুও সহ্য করা যেতো! ছোট ভাইবউয়ের কটুকথা, কথায় কথায় বিধবা, রাড়ি কিংবা স্বামীভুগ বলে খোটা দেয়-- সহ্য করা কঠিন। মা হয়তো কোনোদিন আত্মহত্যাই করেই বসতো, মামাদের বাড়ির পেছনে অনেকগুলো বড়ো-বড়ো শেওড়াগাছ, প্রকাণ্ড সব কাণ্ড ঝুলে আছে, এর একটায় দড়ির একপ্রান্ত, দড়ির অপরপ্রান্ত গলায় বেঁধে ঝুলে পড়লেই ভবলীলা সাঙ্গ। কিন্তু মা হয়তো শুধু এই কাজটি করতে পারছিল না আমার আর সংকরের জন্য...।
ছোটমামা নির্জীব, নির্বিষ। মাকে ছোটমামি যতোই গালমন্দ করুক, অপমান করুক, ছোটমামা মামিকে কিছুই বলবে না। বলতে পারবে না। চুপচাপ তাঁতে গিয়ে বসবে। মাকু-মারার খটরখটর শব্দ তুলবে, যাতে বউয়ের গলা শুনতে না-হয়। বড়োমামা চিরকুমার। কোনো কাজকর্ম করে না। সারাদিন গাঁজায় দম দিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকবে বাড়ির পেছনের শিরিশগাছের নিচে। ইচ্ছা হলে খেতে আসবে, খাবে; না-হলে সন্ধ্যানাগাদ এই গাছের নিচেই বসে থাকবে। শিরিশগাছটি যে বড়োমামার কী লাগে, কে জানে! বাড়ির জায়গাজমি, চকের খেতখামার, তাঁত-- সবকিছুর অর্ধেকের মালিক সে। কিন্তু এসব সম্পত্তির দিকে সে চেয়ে দেখে না। সবকিছু ভোগ করে ছোটমামা। ভীমের মতো গাঁজাখোর এই লোকটি হঠাৎ একদিন গর্জে উঠলো...।
মা ড্রামে রঙ গুলছিল। দুপুরবেলা। কড়া রোদ। মা ঘেমে নেয়ে উঠেছে। দু’তিন দিন জ্বর গেছে মা’র। শরীর ভীষণ দুর্বল। কিছুক্ষণ রঙ গোলার পরই হাঁপিয়ে উঠেছে। সংকর ঘ্যানর-ঘ্যানর করছে মা’র কাছে-- ওর খিদে পেয়েছে। কী মনে করে বড়োমামা হঠাৎ মার কাছে গেল। ঘর্মাক্ত মাকে দেখে বললো-- তোর কী হয়েছে নন্দিতা? তোকে এতো কাহিল দেখাচ্ছে কেন...?
না দাদা। কিছু হয়নি আমার। হয়তো তোমার চোখের ভুল...।
আমার চোখের ভুল! গাঁজা খাই তো, মানলাম। তা চোখের ভুল হতে পারে। সংকর কাঁদছে কেন...?
সবসময় কান্নাকাটি করাই ওর অভ্যাস...।
দুপুরে ও খেয়েছে...?
মা কোনো জবাব দিল না। রঙের ড্রামে কাঠি নাড়তে লাগলো...।
ছোটমামি বড়োঘরের বারান্দায় বসে আয়নায় মুখ দেখছিল। বড়োমামা গম্ভীরস্বরে উচ্চারণ করলো-- ছোটবউ...?
কিছু বলছেন, দাদা...?
নন্দিতা জ¦র থেকে কেবল উঠেছে। ওর কি আজ রঙ না-গুললে চলতো না? সংকর এখনোও না-খেয়ে আছে কেন? কটা বাজে এখন...?
দাদা কি আমাকে চার্জ করছেন...?
না। তোমাকে চার্জ করবো কেন? তুমি পটের বিবির মতো বসে-বসে আয়নায় দাঁত-মুখ দেখছো। নন্দিতা অসুস্থ শরীর নিয়ে রঙ গুলছে। কেন, রঙ কি আজ তুমি গুলতে পারতে না...?
তিন-তিনটে মুখ, দাদা। খাওয়া-পরার খরচ তো কম না। মেয়েকে আবার স্কুলে দিয়েছে। প্রাইমারি পাশ করেছিল, সেটাই তো যথেষ্ট ছিল। আবার হাইস্কুলে কেন? মেয়ের লেখাপড়ারও তো খরচ আছে। আমরা ওদের জন্য এতো করছি, দিদি এইটুকু করতে পারবে না? মেয়েটাকে স্কুলে না-দিলেও বাড়ির টুকটাক কাজ করতে পারতো। দিদির আয়েশ হতো। তা, না-- মেয়ে যেন জজ-ব্যারিস্টার হবে...।
মুখ সামলে কথা বলো, ছোটবউ। নন্দিতারা কি তোমাদেরটা খায়, নাকি আমারটা খায়...?
দাদার কি সিদ্ধি ফুরিয়ে গেছে? পরশুই তো সাগরটা একপোয়া এনে দিল। গাঁজা না-ফুরালে তো আপনি এতোকথা বলতেন না। আমি আপনার গাঁজার জোগাড় দেখছি...।
বড়োমামাকে গাঁজার খোটা দিল ছোটমামি। মামার আর কথা বলতে রুচিতে বাঁধলো। সে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
এরমধ্যে সংসরের নিউমোনিয়া হলো। বড়োমামা বাংড়া বাজারের লোকনাথ ডাক্তারকে ডেকে এনেছিল। ডাক্তার বললো-- এতো দুর্বল শরীর, ছেলেটাকে বোধহয় ঠিকমতো খাবার দেননি, দুর্বল বাচ্চাদের নিউমোনিয়া হলে বাঁচে না...।
সংকর সত্যি-সত্যিই বাঁচলো না...।
এভাবেই আমাদের দিন যাচ্ছিল...।
তখন আমি নবম শ্রেণিতে উঠেছি। মামারা, বিশেষ করে বড়োমামা ভাবছিলো, তৃষিতা বেশ ডাগর হয়ে উঠেছে। ওর একটা সদগতি করা দরকার। নবম শ্রেণির দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা দিতে-দিতেই আমার বিয়ে হয়ে গেল। হদুপুরের কমল বসাক আমার বর। বয়স আমারচে’ অন্তত দ্বিগুণ। তাও মেনে নিলাম। মেয়ে-মানুষের এসব মেনে নিতে হয়-- মাকে দেখেই তো শিখেছি...।
আমার বিয়ের তিনবছরের মাথায়, গৌরব তখন আমার পেটে, মা স্বর্গ পেয়ে গেল। মা হয়তো আমার সদগতি দেখার অপেক্ষায়ই ছিল। কমল বসাক সজ্জন, সদগুণসম্পন্ন মানুষ, কোনো ধরনের বাজে ও অনৈতিক কাজের সাথে সে সংশ্লিষ্ট থাকে না, সংসারের কাজেও কোনো গাফিলতি নেইই, মার খুব প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিল গৌরবের বাবা। মনে প্রশান্তি নিয়েই হয়তো মা স্বর্গে গেল, তবে নাতির মুখ দেখে যেতে পারলো না, এ-নিয়ে মা’র মনে কিছুটা কষ্ট হয়তো ছিল...।
মাঝে-মধ্যেই জ¦র হতো মা’র। সেদিন খুব বেশি জ¦র উঠেছিল। বড়োমামা বললো রাতে প্রলাপ বকছিল-- ‘তাঁত তিনটে এখন আমার, বাড়িভিটি এখন আমার।’ খবর পেয়ে গৌরবের বাবাকে সঙ্গে নিয়ে সকালেই বাংড়া এসেছিলাম। মা তখনো জীবিত। কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছিল। আমি মায়ের কাছে বসলাম। মার ডান হাতটা ধরলাম। মা আমাকে দেখে আমার মুখের দিকে তাকালো। আমার মুখ দেখে মা হয়তো বোঝার চেষ্টা করছিল-- আমি সুখে আছি কিনা। যখন বুঝলো-- তৃষিতা সুখেই আছে, মা চোখ বুঝলো। চোখ বুঝেই স্বর্গে যেতে হয়...।
চার
গৌরবের বাবা বাড়ির মেজো ছেলে। ওরা তিনভাই, এক বোন। বোনটা বাল্যবিধবা। এক ছেলের মা। ছেলেকে নিয়ে ভাইদের সংসারেই থাকে। গৌরবের বাবা মেজো হলেও সংসারের কর্তৃত্ব তার হাতে। কর্তৃত্ব হাতে থাকলেও লোকটি কর্তৃত্ব ফলায় না। বড়োভাইকে মান্যতা দিয়ে, ছোটভাইকে সাথে রেখে তাঁতঘর, তাঁতের ব্যবসা, সুতার ব্যবসা পরিচালনা করে। সবদিকেই তার স্বচ্ছ ও কড়া চোখ। সংসারে কার কী লাগে, বড়োভাই কি বউদি, তাদের দুই বাচ্চা, বিধবা বোন, তার ছেলে; ছোটভাই নির্মল তখনো বিয়ে করেনি, তবুও তার হাতখরচ-- কোথাও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে না। গৌরবের বয়স তখন একবছর। আমার কী দরকার, ছেলের কী লাগবে-- এ দিকেও দৃষ্টি রাখতে ভুল হয় না গৌরবের বাবার...।
হদুপুর বেশ বড়োসড়ো গ্রাম। গ্রামের ষাটভাগ মানুষ বসাক সম্প্রদায়ের। গ্রামজুড়ে সারাদিন তাঁতের খটখট শব্দ। গৌরবের বাবার মধ্যে, দেখি তো, নেতৃত্ব দেয়ার গুণ আছে। বাড়িতেও যেমন সে নেতা, হদুপুরের বসাকদেরও নেতা; যদিও সে কোনো দলের রাজনীতি করে না। তার মুখেই শুনেছি, জয়বাংলা পার্টির শহরের নেতারা তাকে ইউনিয়নের সভাপতির পদ দিতে চায় কিন্তু নিজেই বিনয়ের সাথে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে। দেশে-গাঁয়ে হিন্দুদের এমনিতেই পদে-পদে বিপদ। গ্রামের সবার সাথেই তাল মিলিয়ে চলতে হয়। এরমধ্যে জয়বাংলা পার্টির পদ নিলে জিন্দাবাদ পার্টির লোকেরা অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হবে। অযথাই সে তাদের শত্রু বনে যাবে। কারণ, হদুপুরে বসাকদের ভোট তো কম না। তাদের ভোট ছাড়া যে-কারো পক্ষেই হদুপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জেতা কঠিন। অসম্ভব বললেও ভুল বলা হবে না...।
২০০১ সাল...।
জাতীয় সংসদের নির্বাচন এসে গেছে। গৌরবের বাবা সরাসরি দল করে না বটে, কিন্তু বসাকরা তো তার কথা শোনে। তারা নির্বাচনে, তা হোক ইউনিয়ন পরিষদ কি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচন, গৌরবের বাবার পরামর্শ মতোই ভোটপ্রদান করে। তারা যাকে ভোট দেয়, হদুপুর কেন্দ্রে সেই প্রার্থীই জয়লাভ করে। জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বরাবরই এখানে বিজয়ী হন জয়বাংলার প্রার্থী। এই যে, হদুপুরে জংবাংলার প্রার্থী পাশ করেন, এতো কাউকে ব্যাখ্যা করে বোঝানোর প্রয়োজন হয় না যে, বসাকদের সব ভোটই জয়বাংলার প্রার্থী পেয়েছেন, আর তাতেই তিনি এই কেন্দ্রে পাশ করেছেন...।
এবারের সংসদ নির্বাচনেও হদুপুর কেন্দ্রে জয়বাংলার প্রার্থীর জয়জয়কার। কিন্তু তিনি, রাত ৯টার মধ্যেই খবর হয়ে গেল, নির্বাচনে হেরে গেছেন। শুধু কি তিনি? না, শুধু তিনি হারেননি। জয়বাংলা পার্টিই হেরে গেছে। দেশের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বেগম...।
যাক। নির্বাচনে হারজিত আছে। এটা মেনে নিয়েই রাজনীতি ও নির্বাচন করতে হয়। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার দুঃখ ভুলে বসাকরা কাজে মন দিল। তাঁতে বসল। তাঁতের খটখট শব্দে মুখর হয়ে উঠলো বসাকপাড়া। কিন্তু নির্বাচনের দু’দিন যেতে না-যেতেই ভয়ঙ্কর সব খবর আসতে লাগলো। যারা জয়বাংলার প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে, হিন্দুরা তো জীবনভর জয়বাংলার প্রার্থীকেই ভোট দেয়, এটা কে না জানে, সারাদেশেই তাদের ঘরবাড়ি ভাংচুর করে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। লুট হচ্ছে তাদের গোয়ালের গরু, পুকুরের মাছ, খেতের ধান। গোপালপুরে নাকি জয়বাংলার দুই হিন্দুকর্মী খুন হয়েছে। প্রকাশ্য দিবালোকে, অনেক লোকের সামনে, বাজারের মধ্যে তাদের চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে জিন্দাবাদ পার্টির দুবৃত্তরা। গোপালপুরে গৌরবের বাবার পিসির বাড়ি। তারা ভয়ে, জীবন বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে। হিন্দুপাড়া নাকি এখন বিরাণভূমি। খবর শুনে আমরা তো আমরা, গৌরবের বাবার চোখ-মুখও শুকিয়ে গেল। জিন্দাবাদ পার্টির সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তরা বসাকপাড়ায়ও যদি হামলা করে! আগুন ধরিয়ে দেয় বসাকদের ঘরে-ঘরে। আক্রমণ যদি করে তার বাড়িতেই সবার আগে করবে, এটা অবধারিত। আগুন তার ঘরেই আগে দেবে...।
হদুপুরের জিন্দাবাদ পার্টির নেতা কাদের মামুদ মোল্লা স্বাধীনতার আগে, স্বাধীনতার পরেও কিছুদিন জয়বাংলা পার্টি করতো। তারপর জাসদ-গণবাহিনী করে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কিছুদিন জেল খাটে। জেল থেকে বেরিয়েই সে জিন্দাবাদ পার্টির নেতা হয়ে গেল। এ-নিয়ে গ্রামে বেশ কানাঘুষা হয়েছে, জেনারেলের লোকদের সাথে সমঝোতা করেই নাকি জেল থেকে বেরোয় কাদের মামুদ মোল্লা। এখন রাজনীতিও করে, সুতার ব্যবসাও করে। ব্যবসার সূত্রে তার সঙ্গে গৌরবের বাবার সুসম্পর্ক বিদ্যমান। সেদিন দুপুরবেলা, বাড়িতে বসাকপাড়ার মুরব্বি-শ্রেণির কয়েকজন লোক এসেছে। গৌরবের বাবার সাথে সলাপরামর্শ করছে-- কাদের মোল্লা তো একসময় জয়বাংলা পার্টি করতো, তার সাথে কথা বলা যায় কিনা, সারাদেশে যা ঘটছে, মোল্লা যদি বসাকদের দেখভাল করে তবে দুর্বৃত্তরা কারও বাড়িতে আক্রমণ চালানোর সাহস পাবে না...।
আলোচনা তখনও চলছিল, আমি পানের বাটা নিয়ে কেবলই ঘর থেকে বেরিয়েছি, মুরুব্বিদের পান খেতে দেবো, একদল লোক এসে, সবার হাতেই চাইনিজ কুড়াল, তাদের মধ্যে কাদের মোল্লার ভাতিজা টেরা মামুনও ছিল, গৌরবের বাবাকে কুপিয়ে ফালাফালা করে ফেললো। তারপর কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল আমাদের সব ঘরে। দাউদাউ করে আগুন জ¦লছিল, যেন চিতার আগুন। সব শোওয়ার ঘর, তাঁতঘর, তাঁত-- সব পুড়ে ছাইভষ্ম হয়ে গেল।
গৌরবের বাবা খুন হওয়ার ক’দিন পরই আমার ভাসুর-দেবর বাড়ির সবাইকে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে গেল। আমাকেও ওরা যেতে বলেছিল। আমি যাইনি। যে-বাড়ির মাটিতে আমার স্বামীর রক্ত মিশে আছে, সেই বাড়ি ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারি না...।
তখন গৌরবের বয়স ছিল দেড়বছর। এখন চব্বিশ। মা-বাবা, ভাই, স্বামী-- সবাইকে হারানোর পর এখন অবশিষ্ট আছে শুধুমাত্র গৌরব। ছেলেটাকে বড়ো করতে, লেখাপড়া করাতে আমার যে কী কষ্ট করতে হয়েছে, তা শুধু আমি জানি, আর জানে ভগবান। বসাকপাড়ার ছেলে স্কুলে-কলেজে পড়বে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়রবে-- কতজনের যে চোখ টাটাতো! তাকে আমি কোন্-প্রাণে, আগুনের গোলা যেখানে দিগি¦দিক ছুটছে, কার গোলা কার বুক বিদ্ধ করছে তার ঠিক নেই, সেই ঢাকায় যেতে দিই...?
পাঁচ
তরকারি হয়ে এসেছে। ফুসকুড়ির মতা ফুটছে তরকারির ঝোল। আমি সব জেনেও গৌরবকে আবার বললাম-- কীরে, কথা বলছিস না যে? কী হয়েছে তোর...?
গৌরব মুখ খুললো। বললো-- ‘আমি ঢাকা যাবো, মা...।’
ঢাকা যাবি? এই গ-গোলের মধ্যে! গোলাগুলি-গ-গোল নাকি আরও বাড়ছে...।
আমার বন্ধুরা গুলি খেয়ে মরছে। এখন আমি বাড়িতে বসে থাকলে ওরা আমাকে কাপুরুষ বলবে...।
তুই ছাড়া যে আমার আর কেউ নেইরে, গৌরব...।
সন্তান বড়ো হলে সেই সন্তান আর শুধু নিজের মায়ের থাকে না, মা। সে দেশের সন্তান হয়ে যায়। দেশে কোনো অন্যায়-অবিচার-অনাচার শুরু হলে, ছাত্ররাই সবার আগে এগিয়ে যাবে, প্রতিবাদ করবে, এটাই স্বাভাবিক। ফেসবুকে দেখেছ তো-- রংপুরে আবু সাঈদ পুলিশের গুলির সামনে দুই হাত প্রসারিত করে কীভাবে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৬ জুলাই তারিখটা দেশে ইতিহাস হয়ে গেল। সাঈদ ভাই হয়ে গেলেন জোহা স্যার...।
জোহা স্যার...!
জোহা স্যার রাজশাহী বিদ্যালয়ের রসায়নের শিক্ষক এবং প্রক্টর ছিলেন। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তরান্বিত হয় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা বিক্ষোভকারী ছাত্রদের বুক লক্ষ্য করে বন্দুক তাক করেছিল। আর একপা এগুলেই গুলি করবে। জোহা স্যার খবর পেয়ে সেনাসদস্যদের সামনে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন-- আমার ছাত্রদের বুকে গুলিবর্ষণের আগে আমার বুকে গুলি করতে হবে। সেনারা স্যারকে গুলি করে মেরে ফেলেছিল। সাঈদ ভাই মৃত্যুর আগের রাতে জোহা স্যারকে উদ্দেশ্য করে ফেসবুকে লিখেছিলেন-- ‘স্যার। এই মুহূর্তে আপনাকে ভীষণ দরকার স্যার। আপনার সমসাময়িক যারা ছিলেন, তারা সবাই তো মরে গেছেন। কিন্তু আপনি মরেও অমর। আপনার সমাধি আমাদের প্রেরণা। আপনার চেতনায় আমরা উদ্ভাসিত...।’
হঠাৎ কবি হেলাল হাফিজের একটা কবিতার লাইন মনে পড়লো, বাংলার সুকান্ত স্যার ক্লাশে একদিন পুরো কবিতাটি পড়ে শুনিয়েছিলেন, প্রথম লাইনটি এখনো মনে আছে-- ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়...।’
গৌরব এখন যুবক। তাকে ফেরানো যাবে না। ভগবান কেন এভাবে আমার ললাটলিপি লিখেছেন, জানি না। হয়তো আমার কোনো পাপের ফল! আমি গৌরবকে বললা-- যাবি যদি, যা। স্নান করে আয়। বেগুন কেটে বাজিলা মাছের তরকারি রেঁধেছি। তোর প্রিয় মাছ। বাজিলা মাছের তরকারি দিয়ে ভাত খেয়ে যা। যদি আর কোনোদিন আমার হাতের রান্না না খেতে পারিস...!
পাদটীকা :
তৃষিতা বসাক প্রতিদিনই বাজিলা মাছের তরকারি রাঁধে। গৌরব হয়তো নদীতে স্নান করতে গেছে, এখনই এসে খেতে বসবে। কিন্তু গৌরব আর আসে না...।
অলংকরণঃ তাইফ আদনান