জলধি / গল্প / অপদার্থ
Share:
অপদার্থ

আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি; কারণ, আমি অপদার্থ। কেউ আমাকে ভালোবাসেনি, কেউ আমাকে বিশ্বাস করেনি এবং কেউ আমাকে মূল্যায়ন করেনি। আমি যেন ডাস্টবিনের আবর্জনা--হতাশার নদীতে ভাসমান খড়কুটো। আমার অবহেলিত ও নিঃস্ব জীবনের দুঃখজনক উপাখ্যান শুনতে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করেনি। তুচ্ছ পিঁপড়াও আমাকে কখনও জিজ্ঞেস করেনি, ‘কেমন আছো?’ কোথাও কেউ আমাকে স্বাগত জানাইনি। প্রতিবেশীদের সাথেও তাল মিলিয়ে চলতে পারিনি। যখন তাদের বাড়িতে গিয়েছি তারা আমার মুখের উপর তাদের দরজা দ-ড়াম করে বন্ধ করে দিয়েছে। কখনও কখনও মনে হয়েছে যখন আমার তাপ প্রয়োজন তখন সূর্য তার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। রাতে যখন কাঁটাবনের মধ্য দিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছি--যখন আলো খুব দরকার তখন চাঁদ তার বিবসনা মুখখানা ফিরিয়ে নিয়েছে। আমাকে দেখে পাখিরাও গান বন্ধ করে দেয়। কেউ আমার পিঠ চাপড়িয়ে বলেনি, 'এগিয়ে যাও!' এবং কেউ আমার ধূসর কেশের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি। একবার চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম, খাঁচাবন্দি বানররা আমাকে নিয়ে কম মশকরা করেনি। দাঁত কেলিয়ে বলছিল, ‘তুই একটা অপদার্থ!’ তাদের ঠাট্টা করা দেখে মনে হচ্ছিল আমি তাদের খেয়েপরে বড় হয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর আমার ভাগ্যের দ্বারপ্রান্তে আসেনি। সবাই ভাবে আমার জীবন যেন সুস্বাদু মাছের জীবন। কেউ মনে করে না আমি দু’হাত এবং দু’পা মানুষের মতো জীবন পেয়েছি; বরং তারা ফন্দি আঁটে কীভাবে আমাকে রান্না করে খাবে। এ পর্যন্ত শত শত কবিতা লিখেছি; কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমি ছাড়া কেউ একজন পড়েনি। এর একটিও কোথাও ছাপা হয়নি। আমি এমন একজন অচেনা ও অপ্রকাশিত কবি যে আকাশের দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো বিড়বিড় করে পথচারীদের বিরক্তি উৎপাদন করা ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। আমার যেটুকু গ্রহণযোগ্যতা তা নিজের কাছে। এমনকি চতুষ্পদ প্রাণীদের কাছেও আমি বিতিকিচ্ছিরকম হাস্যকর। বিভিন্ন কারণে আমি আমার লাইফ সম্পর্কে খুবই হতাশ। বলতে পারেন মহামান্য হতাশার রক্তাক্ত চাবুকের নিচে আমার দণ্ডিত বসবাস।
এ পৃথিবী সুন্দর, কিন্তু আমার কাছে নয়। জীবনের কানাগলিতে আশার আলো বারবার আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সবই নিষ্ফল বেদনার মতো। জীবন কি? বিচিত্র আলোছায়ার ধারক, বাহক? সুখ-দুঃখের আধার? ছুটে চলা ঘোড়া? অন্ধ জোছনার হরিণ? জীবনের আসল মানে বুঝি না। জীবন আমার কাছে বিষাক্ত সরীসৃপের মতো যা প্রতি মুহূর্তে আমাকে কামড়ায়। জীবন আমার কাছে নরকের মতো--যেখানে তুষের মতো ধিকিধিকি জ্বলছি।
আমি অবিশ্বাস্যরকম অন্তর্মুখী--শামুকের মতো গুটিয়ে থাকতে পছন্দ করি; এবং ভয়ঙ্কর সংবেদনশীল। মানুষের বর্বরতা, ভণ্ডামি , অপবাদ এবং নোংরাতা আমাকে আঘাত করে, রাগান্বিত করে এবং আমার মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বালায়; কিন্তু আমি কিছুই করতে পারি না। সাহস করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি না। আমার মাথা নিচু হয়ে থাকে ক্রীতদাসের মতো। 
এখন আমি ভগ্নহৃদয়।
কিছু দিন আগে অনঙ্গ কলায় পারদর্শী আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্ধাঙ্গিনী ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে আমাকে একাকিত্বের অন্ধকার জগতে ঠেলে দিয়েছে। সে প্রায় আমাকে গৃহসামগ্রীর মতো ব্যবহার করত এবং জোর করে এক কোণে ফেলে রাখত। তবুও আমি তাকে অনেক ভালোবাসতাম। এ মুহুর্তে একটা মধুর স্মৃতি স্মরণ না করে পারছি না। অনেক দিন আগে, যখন আমি কলেজছাত্র, একদিন কলেজ থেকে ফিরছিলাম। সেদিন সুরেলা বৃষ্টি নামছিল। সঙ্গে ছাতা না থাকায় ভিজে যাওয়ার ভয়ে নুড়িপথ ধরে দৌড়ে গেলাম একটি হলুদ বাড়ির দিকে এবং তার পেন্টহাউসের নিচে এসে দাঁড়ালাম। নড়াচড়া না করে দূরে তাকিয়ে সুবোধ বালকের মতো একটানা দাঁড়িয়ে ছিলাম।
সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম ডালপালাসমৃদ্ধ ঘনপাতাযুক্ত কৃষ্ণচূড়া গাছ। এর যৌবনপ্রাপ্ত অবিশ্বাস্য সুন্দর ফুলগুলি লাল শাড়িপরা য়ুবতীর মতো দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছিল। এক কাকদম্পতি ডালে পাশাপাশি বসে ভিজছিল এবং প্রণয়ের অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করছিল। সেই মজার দৃশ্যটি আমার চোখে স্পষ্ট ধরা পড়ল। হীন্মন্যতায় ভোগা মানুষ আমি। কাকদের প্রণয়ও সহ্য করতে পারিনি। ক্ষোভে তাদের দিকে পাথর ছুঁড়েছিলাম।
‘এদিকে তাকান! ’ পেছনে হঠাৎ সুন্দরী মেয়ের কণ্ঠ। অবাক হয়ে পেছন ফিরলাম। খাড়া নাসিক আর গোলাপ-কপোলের একটা মেয়ে নীরবে এসে কখন যে দাঁড়িয়েছে, ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। তার ভাসাভাসা চোখে দেমাগি ছায়া। 
‘কাকদের দিকে পাথর ছুঁড়বেন না, ’ আবার বলল সে।
প্রথম বুঝতে পারিনি সে কাকে এবং কী বলছিল? যখন বুঝলাম, জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে আপনি?’ পরক্ষণে রেগে গেলাম, ‘কী আশ্চর্য! নিজের চরকায় তেল দেন।'
‘আমি কেউ নই! ’ রহস্য করে উত্তর দিল সে, এবং তারপর বলল, ‘নিরীহ কাক মানুষের শত্রু হতে পারে না। কাক বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় খেয়ে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। অহেতুক ঢিল ছুঁড়ছেন কেন? তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিন।’ তারপর সে ট্র্যাপিস্টের মতো চুপ হয়ে গেল এবং চোখের পাতা নামিয়ে ফেলল। তার সাথে আর কথা বলার চেষ্টা না করে রাস্তায় নামলাম। বৃষ্টি ততক্ষণে মামার বাড়ি গেছে। 
ঘটনাটা এখান থেকেই শেষ হতে পারত কিন্তু হয়নি। নাছোড় অভাব-অনটন এবং ভার্টিগো রোগের কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটা আমার জন্য কঠিন ছিল। কলেজ ছাড়ার পর ছোটখাটো চাকরির জন্য কত জায়গায় ঢু মেরেছি, তার ইয়ত্তা নেই--চাকরি ছিল সোনার হরিণ। প্রায় দেড় বছর পরে, একটা প্রাইভেট অফিস থেকে ইন্টারভ্যু’র কল আসে। তারা চেয়েছিল একজন পুরুষ এবং একজন নারী। আমি সেই ‘পুরুষ’ পদের জন্য একজন অধম প্রার্থী ছিলাম।
বিস্মরণের রাতে হঠাৎ চাঁদ উঁকি দিলে বৃক্ষদের সংসার যেমন চমকিত হয় তেমনি অনেক প্রার্থীর ভিড়ে একজনকে দেখে চমকে উঠলাম। আরে সেই মেয়েটি! সে-ও এসেছে ইন্টারভ্যু দিতে। তবে সে আগের মতো নেই। তার চোখের নিচে কালি, চেহারায় বিষন্নতা; পোশাক-আশাকে অবনতির জলদজাল। ছোড়ভঙ্গ সময় সেলাই করতে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছ? ’
হয়ত চিনতে পারেনি, সে-কারণে ইতস্তত করছিল। তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে স্বাভাবিক হলো।
’কী ব্যাপার, বলুন তো? আপনি এখানে! ’
’আমার ভাঙা কপাল এখানে টেনে এনেছে, ’ ঠাট্টা করে বললাম।
’আমি ঠাট্টা পছন্দ করি না! ’ দারিদ্রের চাপানউতোরে সন্তুষ্ট হলো না সে।
’যারা জীবন যুদ্ধের সৈনিক, তারা ঠাট্টা পছন্দ করবে না, এটাই স্বাভাবিক। আমিও পছন্দ করি না।’
’তাহলে করলেন কেন? ’
’সরি! ’
’এই সরি বলাটা খুব ভালো লাগল।’
বলেই সে মৃদু হাসল।
তার হাসিটুকুই আমাকে সাহসী করে তুলল। বললাম, ’চাকরিটা কী খুব দরকার? ’
’দেখুন, আপনি আবারও ঠাট্টা করছেন! ’
’সরি! ’
এবার সে খুশি হলো না--’বারবার সরি বললেই সবকিছুর সমাধান হয় না।’
’সমাধান তো আমি দিতে পারব না।’
’তাহলে কে দেবে বলুন? সড়ক দুর্ঘটনায় বাবাকে হারিয়েছি। মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। একমাত্র ছোটভাই পড়াশোনা করে। সংসারের বোঝা আমার কাঁধে। তাই চাকরি খুঁজছি। পিওনের চাকরি হলেও চাই।’
তার কথা শুনে ভারাক্রান্ত হলাম এবং নিজের চাকরির প্রয়োজনটা ভুলে গিয়ে আবারো বললাম, ’সরি! ’
আমার মতো করে সে-ও বলল, ’সরি! আপনাকে কষ্ট দিলাম।’
’কষ্টের মধ্যেই আছি; নতুন করে এ আর কি? ’
আমার কথায় সে নরম সুরে বলল, ’আপনার সঙ্গে কে কে থাকে? ’
গাঢ় দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, ’কেউ নেই। আমি একা। এ জগতসংসারে রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই আমার। সাবলেট থাকি। মশা, মাছি এবং টিকটিকি সঙ্গ দেয় আমাকে। ঘরে একটিমাত্র জানাল--সূর্যের আলো সেখানে ঢুকতে অস্বস্তি বোধ করে।’
‘আমার চাইতেও আপনার অবস্থা খারাপ।’ তাকে বিষন্ন দেখাচ্ছিল। 
দুজনই ভাইভা দিলাম। আমি শান্ত থাকলেও তাকে বিষন্ন দেখলাম। হয়ত তার ভাইভা ভালো হয়নি। মাথা নিচু করে আমার সামনে দিয়েই হেঁটে গেল সে। 
সপ্তাহখানেক পর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিয়োগপত্র পেলাম। যোগদান করলাম এক দাম্ভিক মার্কেটিং অফিসারের সহযোগী হিসেবে। আমার দায়িত্ব ছিল রেজিস্টারে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের নাম লিপিবদ্ধ করা এবং সময়ে-সময়ে তার ফাইফরমাশ পালন করা। তার হুকুম পালনে উনিশ-বিশ করলে তিনি আমার বেতন বন্ধ করার ক্ষমতা রাখতেন। বেতন অতটা আকর্ষণীয় ছিল না কিন্তু ওভারটাইম ছিল। মন-প্রাণ ঢেলে ওভারটাইম করতাম।
কোনো এক ফাঁকে মেয়েটির নাম শুনেছিলাম। বেগমদের মতো দাপট নেই, তবুও তার নামের শেষে বেগম ছিল। যোগদানের পর থেকে মনে মনে খুঁজছিলাম তাকে। হঠাৎ ওই অফিসের এক সুন্দরী মেয়ে আমাকে আশ্বস্ত করল সেও আমার মতো নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত। তার চাকরি হয়নি, তখনই নিশ্চিত হলাম। তারপর থেকে তার শূন্যতা আমার চারপাশে ঝরাপাতার মতো ঝরতে শুরু করল। তাকে আরো বেশি করে ফিল করতে লাগলাম। ভাবতে থাকলাম ওর জন্য কী করতে পারি? গোয়েন্দা কাহিনী পাঠের জন্য আমার কোনো খিদে নেই। নৈতিক বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প এবং হ্যাজিওলজি পড়তে ভালো লাগে। যদিও আমার ভার্টিগো আছে, কিন্তু যখন এই ধরনের গল্প পড়তে আরম্ভ করি তখন বই সরিয়ে রাখতে মন সায় দেয় না। আর এভাবেই আমার মধ্যে সহানুভূতিশীল মন তৈরি হয়েছে। শুনেছি, আমার বাবাও দয়ালু ব্যক্তি ছিলেন--গরিব হয়েও তিনি অতিরিক্ত গরিবের কাছে যেতেন।
প্রথম বেতন পেয়েই সালেহার সাথে দেখা করার মনস্থির করি। সে তখন শহরের উপকণ্ঠে থাকত, জানতাম; কিন্তু বাড়িটি নির্দিষ্ট করে চিনতাম না। ইচ্ছে থাকলে অচেনা ঠিকানা খুঁজে বের করা সহজ না হলেও কঠিনও নয়। দুপুরের পর রোদের তেজে যখন নতজানু ভাব, আমি তখন দেখা করতে গেলাম। কিছু তালকানা পথচারীকে জিজ্ঞেস করলাম; তাদের মুখভঙ্গি জানিয়ে দিচ্ছিল তারা শুধু তালকানাই নয় কানাও বটে। খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে এক চ-ুখোর তাদের বাড়ি চিনিয়ে দিল। অস্বাস্থ্যকর ঘেঞ্জি পরিবেশে ছোট্ট একটি বাড়ি--হাঁপানো রোগির মতো হাঁফাচ্ছিল। জং ধরা টিনের দরজা। ভেজানো। ধাক্কা দিলে তা হাট হয়ে খুলে গেল; কিন্তু ভেতরে ঢুকলাম না। টিনে সজোরে ঠোকা দিলে এটি অভদ্রভাবে তার বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করল। জীর্ণ কাপড় পরা শীর্ণ এক কিশোরবালক এসে দরজার উপর দাঁড়াল।
'কাকে চান?' বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সে।
‘সালেহা বেগম আছেন? ’পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম।
’আছে।’
’ডাকতে পারবে? ’
’পারব।’
ভেতরে গেল সে।
হঠাৎ উদুমধুম অস্বস্তি জেঁকে বসল। তাকে কী বলব, কেনই বা এসেছি...এইসব ভাবছি। কিন্তু তার সরব উপস্থিতি আমার অস্বস্তি দূর করল। রান্নাঘর থেকে এসেছে সে। হাত মুছতে মুছতে বিস্মিত নেত্রে বলল, ‘আপনি!’ উত্তর না দিয়ে  হাসতে থাকলাম। সে আমার হাতধরে টেনে নিয়ে গেল বাড়ির ভেতর। মনে হচ্ছিল কতটা পরিচিত আমি! একটি পুরনো কাঠের চেয়ারে বসতে দিল। 
’আপনি ক্লান্ত। চা করে আনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন, তাই না? ’আমার চোখের দিকে তাকাল সে। উত্তর না দিয়ে আগের মতোই হাসতে থাকলাম। সেও হাসিমুখে বেরিয়ে গেল। 
এক দৃষ্টিতে সারাঘর দেখলাম।
ঘুমানোর জন্য একটা সিঙ্গেল খাট। তেল চিটচিটে গদিটি স্বেচ্ছাচারী ছারপোকাদের দখলে। কাঠের পুরাতন আলনা এবং একটি ডিম্বাকৃতি আয়নাসহ কিছু ছোটখাটো গেরস্থালি দ্রব্য। যথাক্রমে কিংবদন্তি কবি রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ধুলোময় দুটি ছবি দেয়ালে উল্লম্বভাবে টাঙানো ছিল। দারিদ্র্যের ছাপ চোখ এড়াই না। চায়ের তেষ্টা যখন বেড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখুনি চা নিয়ে হাজির হলো সে। এক কাপ আমার সামনে দিয়ে আরেক কাপ নিজে নিল।
চায়ে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করল সে, ‘হঠাৎ কী মনে করে? ’
‘মন চাইল, তাই...’ চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুমুক দিলাম।
সুড়ত সুড়ত শব্দ হচ্ছিল দেখে রুষ্ট স্বরে বলল সে, ’এভাবে চা খায়? কেউ শুনলে ভাববে কী? ’
মেয়েটি ভীষণ ঠোঁটকাটা। নইলে মুখের উপর এভাবে কেউ দোষের কথা বলে? লজ্জা-শরমে ঘামছিলাম। আমার জেরবার সুরতহাল দেখে আবার বলল সে, 'ঘামছেন কেন? আজ কি গরমের দিন? ’ বলার পরপরই সে তার কাপ নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল এবং সিলিং ফ্যানের সুইচ পর্যন্ত গেল। ফ্যানটি মান্ধাতার আমলের এবং প্রায় অকেজো। চালু করা মাত্র স্থ’ল মানুষের নাকডাকার মতো ঘরঘর করতে লাগল। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম কখন যে ভেঙে পড়ে! মনে মনে আবার হাসলামও এই কারণে আমার ঘরেও এরকম একটি সিলিং ফ্যান আছে।
সুইচবোর্ড থেকে ফিরে এসে সে আবার আমার সামনে বসে চায়ের কাপ হাতে নিল। আমার মুখ দেখে হাসার কারণ সে অনুমান করল। ফ্যানের বাতাসে তার চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, কপালে আছড়ে পড়া চুল সরিয়ে বলল সে, 'মা অসুস্থ। তার ওষুধ কিনতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। নতুন ফ্যান কিনতে বাড়তি টাকা লাগবে, যা এই মুহূর্তে নেই।’
এবার আমি কথা বলার পয়েন্ট পেয়ে গেলাম।বললাম, 'আপনার অসুস্থ মাকে দেখতে এসেছি। নিশ্চয় শুনেছেন আমার মা নেই। আপনার মা আমার মায়ের মতো। তিনি কোথায়?'
তার নারী মনে হয়ত দ্রুত পৌঁছে গেলাম। পরিচয় করিয়ে দিতে, সে নিজেই আমাকে টেনে নিয়ে গেল যেখানে তার মা বিছানাগতর ছিলেন। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে ঝাপসা দৃষ্টিতে আমাকে দেখলেন। কিছু বলার জন্য বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করছিলেন,আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। বুড়ি খুকখুক করে কাশলেন। আমি তাকে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছেন, আপনি?’ তিনি কাশি দিয়ে আবার বললেন, ‘মরে যাচ্ছি, কিন্তু আমি এভাবে মরতে চাই না। আহা, অসহ্য যন্ত্রণা!'
’কীভাবে মরতে চান? ’ জিজ্ঞস করলাম।
’আমি আমার মেয়ের কষ্ট দেখতে চাই না। সে বেকার। পরিবারের সমস্ত বোঝা তার কাঁধে,' তিনি আবার বললেন। --‘মরার আগে তাকে যদি কোনো সৎপাত্রের হাতে মেয়েকে তুলে দিতে পারতাম! ’
‘সৎপাত্র খুঁজে পাওয়া কঠিন। অসৎপাত্র চাইলে খুঁজতে পারি, ’ বললাম আমি।
বুড়ি কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ’অসৎ হোক আর শয়তান হোক, হলেই হলো রে বাবা! গছাতে পারলেই শান্তি পেতাম।’
’মা, চুপ করো! আমি পচে যাইনি, ’ বলল সে ক্ষোভের সাথে, ’নিজের মেয়েকে নিয়ে এভাবে কেউ বলে? তুমি কেমন মা? এর চাইতে ডাইনি ভালো।’
বুড়ি কাঁদতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে বিলাপের সুরে বললেন, ’আল্লা গরিবদের এত পরীক্ষা করে কেন? তোর বাবাকে অকালেই নিয়ে গেল, আমাকে পঙ্গু বানিয়ে রাখল। আমাদের উপর তার কীসের ক্ষোভ? ’ বলতে বলতে একটু বেশিই বলে ফেললেন তিনি, ’আমরা কী তার পাকা ধানে মই দিয়েছি? বলো তো বাবা!’
তার মাথার স্ক্রু ঢিলে ভেবে না হেসে পারলাম না। হাসতে হাসতে বললাম, ’পাকা ধান কেন তার কাঁচা ধানেও কেউ মই দিতে সাহস করে না। সাহস করলেই সর্বনাশ!’ বেতনের অর্ধেক টাকা সালেহাকে দেওয়ার জন্য এনেছিলাম, বুড়ির মুড ভালো করার জন্য তার হাতে দিলাম। তিনি মনোযোগ দিয়ে টাকার প্যাকেট নাড়াচাড়া করলেন । তখন পর্যন্ত সালেহা জানত না এর ভেতরে কী আছে।
পরের দিন, অফিসে যখন বসের সাথে কথা বলছিলাম, তখন আচমকা সেখানে উপস্থিত হলো সে। প্যাকেটটা ফিরিয়ে দিতে এসেছে। আমাকে ফেরত দিয়ে বলল সে, 'দুঃখিত!' 
আমি বিব্রত বোধ করছিলাম।
বস আগ্রহ নিয়ে আমাদের দেখছিলেন। তার চলে যাওয়ার পর, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘মেয়েটি কে?’ আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বললেন, ‘ভারি মিষ্টি চেহারা! তুমি ভাগ্যবান।' পরক্ষণে বিড়বিড় করে উঠলেন, ’চালচুলোহীন এমন অপদার্থের পেছনেও সুন্দরী ঘুরঘুর করে। মাগিদের রুচি বলে কথা! ’
কয়েকদিন যেতে না যেতেই লক্ষ করলাম বস আমাকে ঈর্ষা করছেন। কথায় কথায় খোঁচা মারেন। কাছে গেলেই বলেন, ’মুরদ নেই একজোড়া স্পঞ্জের সেন্ডেল কিনবার, সে আবার প্রেম করে! ’ প্রতিবাদ করতে পারতাম কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে চুপ থাকতাম। আর এই চুপ থাকাটাই যেন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। একই শার্ট পরে সপ্তাহখানেক অফিস করছি, আমাকে লক্ষ করে বললেন তিনি, 'এটা অফিস! চাকরবাকরও জামা-কাপড় বদলায়।'
মাথা নিচু করে অফিস থেকে বেরোলাম। 
গাড়িতে ওঠার সৌভাগ্য আমার কমই হয়েছে। হেঁটে হেঁটে চলাফেরা করি। তখন সন্ধ্যারাত। আকাশময় তারারা হলুদ ফুলের মতো কেবল ফুটতে শুরু করেছে। তাদের ঘ্রাণ না পেলেও জাদুময় মুগ্ধতার রেণু গায়ে মাখতে মাখতে হাঁটছিলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমার সাবলেট বাসায় ফিরে এলাম। অতঃপর অবাক হলাম।
পলিথিনে মোড়ানো একটি নতুন শার্ট এবং ফুলের তোড়াসহ তেপেচি চিরকুট। মনে মনে ভাবলাম এই অধমের ঘরে কে আসতে পারে! তেমন কাউকে পেলাম না। কৌতূহলী হয়ে বিছানা থেকে চিরকুটটা তুলে নিয়ে ভাঁজ খুললাম--হ্যাপি বার্থডে টু ইউ সালেহা। শেষে আরো দু’এক লাইন লেখা ছিল,এতটাই অভিভূত, আমি না পড়েই চিরকুট রেখে দিলাম। এই প্রথম ‘ভালোবাসা’ নামের এক উজ্জীবিত ঢেউ আমার ধমনীতে বয়ে গেল। শিহরিত হলাম। কেউ একজন যেন দোয়েল পাখির মতো আমার মনের মধ্যে শিস দিয়ে গেল। তখন পর্যন্ত কেউ আমাকে কোনো উপহার দেয়নি। শার্টটা হাতে নিয়ে গভীর আবেগে চুমু খেলাম তাতে। 
পরের দিন, অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। বসের সামনে পড়ি আবার পড়ি না, এরকম লুকোচুরি ভাব অনিচ্ছাকৃত ঘটছিল। তিনি আমাকে ঠিকই খেয়াল করেছেন। ডাকলেন চেম্বারে। তার সামনে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়ালাম। তিনি আমার আপাদমস্তক দেখলেন। অস্বস্তিতে তেতো গেলার মতো ঢোক গিলছিলাম, আর তিনি প্রশংসার খই ফোটাচ্ছিলেন, ‘দারুণ দেখাচ্ছে! কে দিয়েছে শার্টটা? কালারটা বেশ! ’
'ওই মেয়েটা।' লজ্জিত কণ্ঠে বললাম।
’কোন মেয়েটা? ’ জানতে চাইলেন তির্যক দৃষ্টিতে।
’সেদিন অফিসে যে এসেছিল।’ ক্ষীণস্বরে বললাম।
’হাতছাড়া করো না তাকে। রুচিবোধ আছে।’ বললেন তিনি।
হাতছাড়া করিনি অবশেষে। 
সূর্য কারো জন্য অপেক্ষা করে না এবং চাঁদও কাউকে বঞ্চিত করে না। চাঁদের মতো ফুটফুটে একটি শিশু একদিন তার কোলে এল। আমি ওর নাম দিয়েছিলাম ‘জিবা’। ফারসি শব্দ। অর্থ হলো ‘চমৎকার’।
জিবার প্রথম জন্মদিনে বসকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম এবং সেদিনই আমি আমার কবর খুঁড়েছিলাম। তিনি এসেছিলেন কেতাদুরস্ত হয়ে এবং বিভিন্ন ধরনের দামি উপহার সামগ্রী নিয়ে। আঁটোসাটো ঘর, বসতে দেওয়ার মতো আসবাব নেই, তবুও প্রশংসা করলেন, ’কী সুখি পরিবার! তোমাদের দেখে হিংসে হচ্ছে।’ 
তারপর থেকে তিনি মাঝেমাঝে আমার সাবলেট বাসায় এসে গল্প-আড্ডায় সময় কাটাতেন এবং আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে যেতেন। আমি সব জেনেও তাকে নিয়ে কটুকথা বলিনি। নীরবে সহ্য করেছি। কখনো কখনো স্ত্রী’র মাত্রাতিরিক্ত দুর্ব্যবহার বিনা প্রতিবাদে হজম করেছি। এছাড়া আমার মতো একজন অপদার্থ কীই-বা করতে পারে! 
হঠাৎ করেই জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে গেল এবং সামান্য আয়ে সংসারের ব্যয় বহন করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে পড়ল। সালেহার লাইফস্ট্যাইলেও পরিবর্তন এসেছে। সে আগের মতো সামান্যতেই খুশি হয় না। তার চাহিদা মেটাতে এবং মেয়ের দুধের জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছিলাম। বুকের সৌন্দর্য নষ্ট হবে, তাই সে বেবিকে স্তন খাওয়াতে চাইত না। বুকের দুধ খাওয়ানোর বিষয়ে কথা বললেই তেলে-বেগুনে জ¦লে উঠত--তোমার মতো অপদার্থ দিয়ে কিছুই হবে না! না পারো বউয়ের সখ মিটাতে না পারো মেয়ের দুধ কিনতে! গলায় দড়ি দিয়ে মরতে পারো না! আমরা মা-মেয়ে দুজনেই বেঁচে যাই! ’
গলায় দড়ি দেওয়ার চাইতে ধার করা উত্তম। বসের কাছ থেকে প্রায় টাকা ধার করতাম। তিনি হাসিমুখে টাকা ধার দিতেন এবং বলতেন, 'সঙ্কোচ করবে না। তোমার পরিবার আমার পরিবার।'
পদাধিকারবলে তিনি আমার বস। তাকে বিশ্বাস করেছি এবং কখনই ভাবিনি যে আমার পরিবার তার পরিবার হতে চলেছে। যখন বুঝতে পারলাম তখন আমাকে চাকরি খোয়াতে হয়েছে। আমার স্বপ্নের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। হতাশার কিনারে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করলাম, আমি প্রতারিত হয়েছি। 
আমি আমার স্ত্রী এবং মেয়েকে খুব ভালোবাসতাম। তারা ছিল আমার জীবনে যমজ তারার মতো--অন্ধকার রাতে পথ দেখাত। তাদের ভালোবাসা আনন্দ-ঝর্ণার মতো আমার হৃদয়ে বয়ে যেত। তাদের হাস্যোজ্জ্বল মুখ আনন্দের সাগরে যেমন ভাসাত তেমনি তাদের মলিন মুখ আমাকে কষ্টের বেনোজলে নিক্ষেপ করত। ডিভোর্স লেটার হাতে পেয়েছি মাত্র তেরো দিন আগে--অথচ প্রবলভাবে অনুভব করছিলাম তেরো মাস পার করে ফেলেছি আমি।
হঠাৎ একটি পুরনো এবং ধুলোময় ফ্যামিলি অ্যালবাম খুঁজে পেলাম। ধুলো ঝেড়ে এটি নিয়ে বসলাম এবং কিছু ফটোর দিকে তীক্ষœদৃষ্টি দিলাম। হিরণ¥য় স্মৃতির এক প্রশান্তময় ছবি আমাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ছবিতে দু’পাটে বেণি করা মেয়ে আমার কাঁধে পা ছড়িয়ে বসেছিল এবং স্ত্রীকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে ছিলাম। ছবিটা দেখে এতটাই হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম কিছুই ভাবতে পারছিলাম না আর। অনেকক্ষণ পর মনে হলো তাদেরকে ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন; স্রোত ছাড়া যেমন জলধি বর্ণহীন; ক্লোরোফিল ছাড়া যেমন বৃক্ষপাতা।
যেদিকে তাকাই শুধু অন্ধকার! অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে ভয়ঙ্করভাবে আটকে যাচ্ছিলাম। সিদ্ধান্তহীনতার পেন্ডুলাম চোখের সামনে দুলছিল--শুধুই দুলছিল। এক সময় মনে হলো এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। একদিন না একদিন অলঙ্ঘনীয় মৃত্যুর স্বাদ নিতেই হবে--দুদিন আগে বা পরে। এই পৃথিবীর সমস্ত মায়া ত্যাগ করতে হবে। পৃথিবীতে কে চিরকাল বেঁচে থাকে! 
সবকিছু বিবেচনা করে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার সাহসী সিদ্ধান্ত নিলাম; কিন্তু কীভাবে করব, ভাবতে পারছিলাম না। ফ্যানের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর সিদ্ধান্ত নিলাম গলায় ফাঁস দেব। এটিই হবে সহজ ও আনন্দদায়ক মৃত্যু। কিন্তু উদ্ভট পাগলের মতো মৃত্যু-পরবর্তী চিন্তা নিয়ে ভাবতে লাগলাম। আমার লাশ কে গ্রহণ করবে এবং কোথায় দাফন করা হবে? আমার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। চোখ বন্ধ করে তৃতীয় নয়নে দেখার চেষ্টা করলাম। যা দেখলাম তা ভয়ানক--আমার নিথর দেহ সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে--ঘর ভেতর থেকে বন্ধ--মাথার চুল অগোছালো-- লাল জিভ ভয়ঙ্করভাবে বেরিয়ে পড়েছে--পচা শরীর থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে--মশা-মাছি ভনভন করছে।
এ পৃথিবী আমার কাছে রহস্যময় সরাইখানার মতো। পথিকের মতো এখানে এসেছি, আবার চলেও যাচ্ছি। সিলিং ফ্যানের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ মনে পড়ল আমার অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য সালেহাকে দায়ী করা হতে পারে। তাই একটি চিরকুট লিখলাম: আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। এবার একটা কাঠের চেয়ারে উঠে দাঁড়ালাম। গলায় দড়ির এক প্রান্ত এবং অন্য প্রান্ত সিলিং ফ্যানের সাথে গিঁট দিলাম। আমার মস্তিষ্কে হঠাৎ বরফঝড় বইতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সামনের দেয়াল অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। জানলার রঙিন পর্দা তার রং হারাচ্ছিল। কাউন্ট ডাউন শুরু করলাম--৫-৪-৩-২-১। আমার মেমোরি মুছে যাচ্ছিল। লাথি মেরে চেয়ার দূরে সরালাম।
যখন চেতনা ফিরে এল, নিজেকে আবিষ্কার করলাম একটি দুধ সাদা বিছানায়। ‘আমি কোথায়?’ বিড়বিড় করলাম। কেউ একজন পাশ থেকে বলল, 'হাসপাতালে। ফ্যানে ঝুলে মরতে গিয়েছিলি, কিন্তু মরিসনি। অপদার্থরা মরতেও জানে না।'
তাকে জানার চেষ্টা করলাম। সে আমার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু নিশিকান্ত। নিজেকে অপদার্থ বলে নিজেকেই প্রায় ধিক্কার দিতাম, নিশি তা জানে। জিজ্ঞেস করলাম, 'মৃত্যু কী আমাকে পছন্দ করেনি?'
সেও রগড় করে বলল, ’মৃত্যুর কোনো দোষ ছিল না। এটা তোর আধমরা ফ্যানের দোষ। তোর শরীরের ভার সইতে না পেরে সিলিং থেকে খসে নিচে পড়েছে।’ পরক্ষণে রাগত স্বরে বলল, ’কেন আত্মহত্যা করতে গেছিলি? বোকা কোথাকার! ’
আমি বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। হঠাৎ সামরিক কুচকাওয়াজের আওয়াজ পেলাম। ‘কী হচ্ছে? ’ জিজ্ঞেস করলাম।
‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই হাসপাতালের বাউন্ডারির ওপারে ক্যাম্প তৈরি করেছে। পুরো জাতি এখন আতঙ্কিত, ’ বলল সে, ‘এই হাসপাতাল ঝুঁকির মুখে। যে-কোনও সময় তারা হামলা করতে পারে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালাতে হবে। একবার প্রাণে বেঁচে গেছিস, এবার আর রক্ষা পাবি না।'
’বাঁচার জন্য কেউ ফাঁস দেয় না রে বন্ধু। আমি মরতেই গিয়েছিলাম, ’ স্পষ্ট করলাম।
’মরতে যখন চাস তখন পবিত্র কাজেই মরিস, ’ বলল সে।
আমরা খোলা রাস্তায় নেমে যখন বাসার দিকে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখুনি একদল সেনা আমাদের ঘিরে ধরল এবং বজ্র কণ্ঠে বলল--হ্যান্ডস আপ! আমরা হাত উপরে ওঠালাম। কাছে এসে একজন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কী মুসলমান?’ আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা নাড়লাম, কিন্তু তারা বিশ্বাস করল না। তাদের মধ্যে অন্তত দু'জন আমাদের দিকে তাদের রাইফেল তাক করল। আমরা ভয় পাচ্ছিলাম।  নির্দেশ দিল, ‘তোমাদের  ট্রাউজার খুলে ফেলো!’ তাদের নির্দেশ মতো  ট্রাউজার খুলে ফেললাম। কিন্তু নিশি? সে তো হিন্দু। ভয়ে তার হৃৎকম্পন বেড়ে গিয়েছিল, তবুও সে ট্রাউজার খুলছিল না। একজন বলল, ’অ, বুঝেছি! তোমার সুন্নত নেই।’ --‘আমি হিন্দু। এটা আমার ধর্মীয় পরিচয় কিন্তু আমার সত্তা নয়। আমার সত্তা আমি একজন মানুষ।'  তারা তার কথায় কর্ণপাত না করে তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর আমার সামনে কুকুরকে গুলি করার মতো গুলি করে মারল তাকে।
দুটি ঘটনা একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল--আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা এবং বন্ধুর পৈশাচিক মৃত্যু। আমার মেয়ের মুখ যেমন মনের আয়নায় হঠাৎ হঠাৎই ভেসে উঠত তেমনি আমার বন্ধুর মুখও। তার কান্তিময় চেহারায় এমন আবেদন ছিল যা তাকে স্মরণ করতে বাধ্য করত। 
আমার শরীরে নিন্দুকেরা যে লেবেল সাঁটিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে আমি অপদার্থ। তাহলে কীভাবে প্রতিশোধের স্ফুলিঙ্গ ছড়াব? অল ফুলস ডে, স্টলে বসে চা খাচ্ছিলাম--পাকিস্তান বিরোধী লোকজন একে অপরের সাথে কথাবার্তা বলছিল; কিন্তু খুব সাবধানে। তারা দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক--যাতে তারা শত্রুদের ক্যাম্প ধ্বংস করতে পারে। 
আমি অপদার্থ--আমি ভীতু--আমি কাপুরুষ--আমি চিকেনহার্টেড। এত কিছুর পরও আমি তাদের সাথে প্রশিক্ষণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। পবিত্র মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা অভিমানবশত আত্মহত্যা করার চাইতে নিঃসন্দেহে অনেক ভালো।
দু’আঙুলের ফাঁক গলে অবারিত জোছনা নেমে যাচ্ছিল। এমন মায়াময় রাতে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য তাদের সাথে মিশে গেলাম। নো-ম্যানস ল্যান্ডের পরে অনেকগুলো প্রশিক্ষণ শিবির ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য দিনের আলো চোখ মেলার আগেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া। পথচলা ছিল ভীতিকর কিন্তু আমার কলিজায় কোনো ভয়-ডর ছিল না। নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম আমরা। নানা রকম বন্য ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। কখনও কখনও গভীর জঙ্গল থেকে শূকরের গর্জন ভেসে আসছিল--শেয়ালের হাঁকডাক। দীর্ঘ হাঁটার পর ক্লান্তিকরভাবে অবশেষে সেখানে পৌঁছুতে সক্ষম হই।
তিন মাস পর মাতৃভূমিতে ফিরে এলাম। বেড়ালের সাহস নিয়ে দেশ ছেড়েছিলাম, ফিরে এলাম বাঘের সাহস নিয়ে। এসেই ধনুকভাঙা পণ করলাম যেভাবেই হোক ক্যাম্প ধ্বংস করব--যেখান থেকে আমার ভেতরে প্রতিশোধের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছিল।
আমরা যে দলে বিভক্ত ছিলাম, আলোচনাসাপেক্ষে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, গভীর রাতে সৈন্যরা ঘুমিয়ে পড়লে, আমি ক্যাম্পে একাই ঢুকব এবং তেমন কিছু না ঘটলে আত্মঘাতী বোমাহামলা চালিয়ে তাদের ধ্বংস করব। সুইসাইড বোম্বার হিসেবে ট্রেনিং করেছি, কাজেই কীভাবে ক্যাম্পে প্রবেশ করব এবং কীভাবে বোমা ফাটাব, তা নিয়ে খুব বিচলিত ছিলাম না।
কাক্সিক্ষত রাত ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল এবং রহস্যময় অন্ধকার চাদরের মতো ক্যাম্প ঢেকে ফেলছিল; আর আমি বোধের চাবুকে রক্তাক্ত হচ্ছিলাম। আজ রাত হবে আমার শেষ রাত। আগামীকাল বলে কিছু আর থাকবে না আমার। হায়রে পৃথিবী! আজ আছি কাল নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছিন্নভিন্ন হব আমি--আমার রক্তে রঞ্জিত হব। আমার লাশ কেউ খুঁজে পাবে না--কোথাও দাফন করা হবে না--কেউ আমার কবরে এপিটাফ লিখবে না।
অতীতের চিহৃগুলো মনের দরজায় কড়া নাড়ছিল। আমার মেয়ের পবিত্র মুখ এবং স্ত্রীর ঘৃণা মিশ্রিত মুখ দিব্য দেখতে পাচ্ছিলাম। এখন পর্যন্ত যে মুখটি সবচেয়ে বেশি ঘোরাফেরা করছে তা হলো আমার মায়ের মুখ। তার চিরচেনা সবুজ মুখ দৃঢ়ভাবে অনুভব করছি। তবে মদ্যপ বাবার মুখ নয়। পান থেকে চুন খসলেই মাকে মারধর করত। তীব্র ঘৃণা করি তাকে এবং তার যাবতীয় ক্রিয়াকর্মকে। যে বাবা তার সন্তানের ভরণ-পোষণ দিতে পারে না সে কেন সন্তান জন্ম দেয়? তার কারণেই আজ আমার এ অবস্থা। সে যদি জন্ম না দিত কেউ আমাকে অপদার্থ বলতে পারত না। কেউ আমার স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে ভেগে যেত পারত না। জীবনভর স্বপ্ন লালন করেছি মুদ্রিত অক্ষরের কবি হব, কিন্তু হতে পারিনি। দু’মুঠো ভাত জোগাতেই হিমশিম খেতে হয়েছে আমাকে এবং আমাদের। 
আর কখনও কোকিলের গান শুনতে পারব না--পারব না চাঁদনী রাতে হাঁটতে--সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ দেখতে--গাঙচিলের ওড়াউড়ি। আর পারব না গন্ধমাতাল ফুলের গন্ধ নিতে--সংবেদনশীল প্রজাপতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে--যে কবিতা আমার আত্মার নীরব গর্জন পারব না আর লিখতে।
ক্যাম্পের দেয়াল ঘেঁষে ওপারে একটা আমগাছ; কিন্তু তার ডাল এপারেও প্রায় মাটি ছুঁয়ে ছিল। সেই ডাল ব্যবহার করে দেয়াল টপকালাম। তারপর পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পের একেবারে ভেতরে। শত্রুরা ঘুমিয়ে পড়েছে। বাতাসের চাপা ফিসফিসানি ছাড়া চারদিকে পিনপতন নীরবতা। আকাশের মিটিমিটি তারা বোমার বোতাম টিপতে আমাকে উদ্বুদ্ধ করছিল। আমি ঘুমন্ত বোতাম স্পর্শ করলাম। মাত্র কয়েক সেকেন্ড...এরপর কী হবে, জানি না। আমার প্রিয় দেশবাসী, বিদায়!



অলংকরণঃ তাইফ আদনান